মাদক বিক্রিতে বাধার মাশুল কি মৃত্যু? রায়পুরে সাহসী এক যুবকের করুণ বিদায়

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যাওয়া মাদকের বিষাক্ত ছোবলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এক চরম ও মর্মান্তিক মাশুল দিতে হলো এক যুবককে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ার জেরে ছুরিকাঘাতের শিকার মো. সাগর (৩২) দীর্ঘ ১৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানলেন। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পেশায় একজন টাইলস মিস্ত্রি সাগরের এই অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত সাগর রায়পুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১২ জুন। রায়পুর শহরের নুরুল ইসলাম মুন্সী সড়ক এলাকায় সাগরের চোখের সামনে মাদক বিক্রির চেষ্টা করছিলেন স্থানীয় নুরুল আমিন (৪৫) নামের এক কুখ্যাত মাদক কারবারি। জননিরাপত্তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে সাগর ওই মাদক বিক্রিতে সরাসরি বাধা প্রদান করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাদক বিক্রি নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে নুরুল আমিন তাঁর কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে সাগরের বুকে সজোরে আঘাত করেন।

ছুরিকাঘাতের পরপরই সাগরের লিভার ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর জটিল অস্ত্রোপচার করা হলেও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণের কারণে তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

সাফল্যের সঙ্গে অপরাধীকে শনাক্ত করলেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সাগরের ভায়রা মো. রাজন জানান, অভিযুক্ত নুরুল আমিন দীর্ঘকাল ধরে এলাকায় নির্বিঘ্নে মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিনই নুরুল আমিনকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে সাগরের শারীরিক অবস্থার অবনতি ও মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় গত সোমবার পুলিশ পুনরায় তাঁকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দেশ মিডিয়াকে জানান, “মাদক বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই জঘন্য হামলার সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। আমরা মূল অভিযুক্তকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছি। সাগরের মৃত্যুর পর এখন মামলাটি একটি পূর্ণাঙ্গ হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে এবং দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব প্রদর্শন করবে।”

একটি সাহসী প্রতিবাদের এমন রক্তাক্ত সমাপ্তি রায়পুরবাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের দাবি, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে কেবল সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও অপরাধীদের দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি নিশ্চিত করা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।