দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও কঠোর সিদ্ধান্তের সাক্ষী হলো উচ্চ আদালত। ঋণখেলাপির অযোগ্যতা কাঁধে নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হলেও শেষ রক্ষা হলো না চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তাঁর সংসদ সদস্য পদের প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পরও তিনি আর একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারছেন না। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।
আদালতের এই সিদ্ধান্তকে দেশের ব্যাংকিং খাত ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা। রায়ের পর আপিলকারী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে বলেন, "ঋণখেলাপি হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আদালত আজ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের আদেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে গেল যে—কেউ ঋণখেলাপি হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত আইনের জাল থেকে তাঁর নিষ্কৃতি নেই।"
এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ মিডিয়াকে জানান, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় দেশের সকল নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক। আদালত তাঁর প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করায় তিনি আর জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে না কি সেখানে পুনরায় নতুন করে ভোটগ্রহণ বা উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই আইনি লড়াইয়ের পথ ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ ও নাটকীয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে কয়েক শ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ ওঠে। তবে নির্বাচন কমিশন সেই সময় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। পরবর্তীতে একই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আনোয়ার সিদ্দিকী এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ এক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ শুনানি ও আইনি পর্যালোচনা শেষে আজ ৩০ জুন আপিল বিভাগ সেই স্থগিতাদেশকে স্থায়ী করে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের চূড়ান্ত রায় দিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসলাম চৌধুরীর মতো একজন হেভিওয়েট প্রার্থীর এমন বিদায় চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড এলাকায় এখন পরবর্তী জনপ্রতিনিধি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রবল কৌতূহল বিরাজ করছে। একই সাথে এই রায় ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে বাধ্য করবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।