মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণাঙ্গনে গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরানের জব্দ করা ২৪ বিলিয়ন (২ হাজার ৪০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল সম্পদ অবমুক্ত না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা আর একবিন্দুও সামনে এগোবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন যদি পুনরায় কোনো সামরিক হঠকারিতা বা অভিযান শুরু করে, তবে তা এক ‘অন্ধকার করিডোরে’ প্রবেশ করবে বলেও চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মোহসেন রেজাই সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আলোচনা বর্তমানে এক গভীর অচলবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এবং এই অচলাবস্থা ভাঙার সম্পূর্ণ দায়ভার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। এখন বল মূলত ট্রাম্পের কোর্টেই রয়েছে।’ কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ইরান একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই প্রথম ধাপে ১২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, এই মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করা হলে ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের যে ‘স্ট্র্যাটেজিক লেভারেজ’ বা কৌশলগত চাপ রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী যা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কঠোর হবে। বিশেষ করে তিনি ইরানকে সরাসরি নগদ অর্থ হস্তান্তরের যেকোনো প্রক্রিয়ার কঠোর বিরোধিতা করছেন। এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রশি টানাটানির মধ্যেই গত শুক্রবার ওমান উপসাগরে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ওই এলাকায় অবস্থানরত দুটি মার্কিন ‘ডেস্ট্রয়ার’ বা যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ‘সর্তকতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র’ নিক্ষেপ করেছে, যার ফলে জাহাজ দুটি এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তেহরানের দাবি, মার্কিন নৌবাহিনী কর্তৃক বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের এই দাবিকে ডাহা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানি বাহিনী মার্কিন কোনো যুদ্ধজাহাজে হামলা বা গুলি চালায়নি। তাঁদের মতে, এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা যুদ্ধবিরতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতো এবং পেন্টাগন তার যথাযথ জবাব দিত। বর্তমানে মার্কিন বাহিনী ওই অঞ্চলে তাঁদের নৌ-অবরোধ কঠোরভাবে কার্যকর রাখছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে সামরিকভাবে কোণঠাসা হলেও ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের হাতে বর্তমানে প্রায় ৯০০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় এক উদ্বেগের কারণ। এই ইউরেনিয়াম মজুত ত্যাগ এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ইতিমধ্যে ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে রুদ্ধশ্বাস বৈঠক করেছেন। আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বিশ্ব রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।