ইউরোপের অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ড আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের মুখোমুখি। দেশটির জনসংখ্যাকে ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে আজ রোববার (১৪ জুন ২০২৬) দেশজুড়ে এক নজিরবিহীন গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রস্তাবটি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থনে পাস হয়, তবে তা বৈশ্বিক জনমিতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সাহসী দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই উদ্যোগকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে সুইজারল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে তপ্ত বাদানুবাদ চলছে, আজকের এই ভোটই তার চূড়ান্ত ফয়সালা করবে।
প্রস্তাবের নেপথ্যে কোন পরিকল্পনা?
ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘সুইজ পিপলস পার্টি’ (SVP) এই নজিরবিহীন প্রস্তাবটির প্রধান উদ্যোক্তা। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা কোনোভাবেই ১ কোটির সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। প্রস্তাবটিতে একটি বিশেষ ‘ট্রিগার পয়েন্ট’ রাখা হয়েছে; যদি জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছায়, তবে সরকারকে তখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের অনুমোদন সীমিত করা এবং দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের আনার ক্ষেত্রে (Family Reunification) কড়া বিধিনিষেধ আরোপ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি জনসংখ্যা ১ কোটিতে পৌঁছে যায়, তবে সুইজারল্যান্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গে থাকা মুক্ত যাতায়াতসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
আবাসন সংকট না কি অর্থনৈতিক ধস?
প্রস্তাবটির সমর্থকদের যুক্তি অত্যন্ত সরাসরি। তাঁরা বলছেন, ২০০২ সালে যেখানে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে ৯১ লাখে দাঁড়িয়েছে। এই দ্রুত জনবৃদ্ধির ফলে আবাসন বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাবে বাড়িভাড়া আকাশচুম্বী। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জীবনযাত্রার সেই চিরচেনা আভিজাত্য ও মান বজায় রাখতেই তাঁরা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন।
বিপরীতে, সুইস সরকার, বড় বড় ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই প্রস্তাবকে ‘আত্মঘাতী’ বলে বর্ণনা করেছে। তাঁদের মতে, সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি মূলত বিদেশি শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যসেবা খাত, পর্যটন ও আতিথেয়তা এবং বয়স্কদের সেবা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক বিদেশি কাজ করছেন। অভিবাসন সীমিত করা হলে দেশটিতে ভয়াবহ শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুইজারল্যান্ড একঘরে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী ও নেতিবাচক।
ভোটের সমীকরণ ও জনমত
সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। ফলে জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন কাজ করছে ভোটারদের মধ্যে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বলছে, লড়াই হবে অত্যন্ত সমানে সমান। যদিও প্রস্তাবের বিরোধীরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে, তবুও প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই আজ নির্ধারণ করবেন সুইজারল্যান্ড কি তাঁর উন্মুক্ত দুয়ার বন্ধ করে দেবে, নাকি অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেই বেছে নেবে। সারা বিশ্বের সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আজ বার্নের দিকে তাকিয়ে আছেন, কারণ এই গণভোটের ফল ইউরোপের অন্যান্য দেশের অভিবাসন নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।