সিন্ধু নদ নিয়ে যুদ্ধের হুংকার? পাকিস্তানের মন্ত্রীর বিতর্কিত ‘হাত কেটে দেওয়ার’ হুঁশিয়ারি

দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি’ (Indus Waters Treaty) নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। পানি ব্যবহারের অধিকারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বাদানুবাদ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের একজন শীর্ষ মন্ত্রী সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রাপ্য পানির ওপর কেউ হাত দিলে সেই হাত ‘কেটে ফেলা হবে’। ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে এমন কঠোর ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য এল।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রী সি আর পাতিল ঘোষণা করেন যে, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভারত তাঁর অংশে থাকা সিন্ধু নদের সমস্ত পানি ব্যবহারের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করবে এবং তা কার্যকর করবে। ভারতের এই একতরফা সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ পাকিস্তান সরকার একে তাঁদের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হিসেবে দেখছে।

ইসলামাবাদে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক সরাসরি নয়াদিল্লির দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী মূলত সিন্ধু নদের পানির কলটি নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তিনি সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও আসতে দিতে চান না। মুসাদিক মালিক বলেন, “আমাদের দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কেউ যদি আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্ধেক কর্মসংস্থান এবং ২৫ শতাংশ অর্থনীতির ওপর আঘাত হানে, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। পানির এই অধিকার খর্ব করা হলে ভারতকে তার চড়া মূল্য দিতে হবে।”

আন্তর্জাতিক প্রথা ও আইনের প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তানি এই মন্ত্রী যুক্তি দেন যে, নদীর গতিপথ বা প্রবাহ বন্ধ করার অধিকার কোনো দেশ এককভাবে রাখে না। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত হওয়া এই চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেন, সিন্ধু নদের পানি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা, যা নিয়ে কোনো আপস করা সম্ভব নয়। তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের কড়া অবস্থানের কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন।

অন্যদিকে, ভারত সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় ও কঠোর। গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে একটি নৃশংস আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সাময়িকভাবে স্থগিত বা মুলতবি ঘোষণা করার পথে হাঁটে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, পাকিস্তান যতক্ষণ না তাঁদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সন্ত্রাসী পরিকাঠামো এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে সমূলে উৎপাটন করার দৃশ্যমান প্রমাণ দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই পানি চুক্তি পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পানির এই লড়াই এক ভয়াবহ ‘হাইড্রো-পলিটিক্স’ বা জল-রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে, যা এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।