শুক্রবারেই কি মিটছে সংঘাত? তেহরান-ওয়াশিংটন চুক্তির মুখে ইরানজুড়ে বিদ্রোহের আগুন

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও আলোচিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের ‘ডেডলাইন’ ঘনিয়ে এলেও তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বইছে প্রবল ঝড়ের পূর্বাভাস। আগামী শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকলেও খোদ ইরানের ভেতরেই চরম বিরোধিতার মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন পক্ষ। বিশেষ করে দেশটির প্রভাবশালী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে ‘বিপর্যয়কর আত্মসমর্পণ’ হিসেবে অভিহিত করে রাজপথে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে তেহরানের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন চুক্তিটির ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য কামরান গাজানফারি এক বিবৃতিতে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বিজয় আর মার্কিন পশ্চাদপসরণের যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। একই সুরে সুর মিলিয়ে কট্টরপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির নিকটাত্মীয় এবং রাজানিউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেইসাম নিলি এই চুক্তিকে ইরানের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম অবমাননাকর বলে দাবি করেছেন। তাঁদের প্রধান অভিযোগ হলো—প্রস্তাবিত চুক্তিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই, নেই কোনো যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ। এমনকি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের একক নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।

তীব্র এই সমালোচনার মুখে পাল্টা অবস্থান নিয়েছে ইরানি আলোচক দল। সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদি এক বিশেষ অডিও বার্তায় চুক্তির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই চুক্তি কেবল যুদ্ধের অবসানই ঘটাবে না, বরং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি জোরালোভাবে বলেন, “তেহরানকে তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো কঠিন শর্তে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়নি। উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আমরা আগামী ৬০ দিনের একটি বিশেষ বাফার টাইম বা আলোচনার সময় পেয়েছি।”

মোহম্মাদি আরও দাবি করেন যে, এই চুক্তি ২০১৫ সালের বারাক ওবামা আমলের চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরান এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছে এবং এই রুটটি চাইলে মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এছাড়া বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্ধেক ছাড় দেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র দেবে না, বরং আরব দেশগুলো এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এদিকে তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে কট্টরপন্থী ‘পেদারি ফ্রন্ট’-এর সমর্থকরা। প্রভাবশালী ভাষ্যকার ও কায়হান পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হোসেন শরিয়তমাদারি এক খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তিলে তিলে গড়া ‘হরমুজ অস্ত্র’ এক নিমেষে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে? তাঁরা এমনকি ইসরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করার আশঙ্কায়ও উদ্বিগ্ন। বিপরীতে, সরকারের সমর্থকরা বলছেন যে এই বিক্ষোভ মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অধিকাংশ ইরানি নাগরিকই যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি চায়।

মজার বিষয় হলো, ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থীদের এই কঠোর অবস্থান পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ইমেজ বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। ট্রাম্প এই চুক্তিকে ওবামা আমলের চেয়ে ‘শ্রেয়’ হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক আমূল পরিবর্তন আনবে। ট্রাম্পের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি প্রমাণ করা যে, যুদ্ধের ব্যয়বহুল পথ বেছে নিয়ে তিনি কূটনৈতিকভাবে আসলেই বেশি কিছু অর্জন করতে পেরেছেন কি না।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।