সূর্যাস্তের বিষণ্ণতা আর তিহার জেলের স্যাঁতসেঁতে উঠান—বন্দী নম্বর ৬২৬৭১৪-এর জন্য এটি কেবল সময়ের বিবর্তন নয়, বরং কেড়ে নেওয়া এক লড়াকু জীবনের নীরব আর্তনাদ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন সেলের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, তখন উমর খালিদের মনে পড়ে দেড় শতাব্দী আগে ফিওদর দস্তয়েভস্কির লিখে যাওয়া সেই যন্ত্রণার কথা। দস্তয়েভস্কিও তাঁর কারাজীবনের ‘মেমোয়ার’ বা স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, সূর্যাস্ত মানেই জীবনের আরও একটি মূল্যবান দিন বন্দিদশার গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিনা বিচারে কারান্তরালে থাকা তুখোড় ছাত্রনেতা উমর খালিদ সম্প্রতি প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তাঁর এই মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উমর খালিদ এখন কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং নরেন্দ্র মোদি সরকারের ভিন্নমত দমনের এক জীবন্ত ‘প্রোফাইল’ বা প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ১২ বছরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি প্রশাসন বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করছে। উমর খালিদ একজন মুসলিম এবং বামপন্থী অধিকারকর্মী হিসেবে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের কড়া সমালোচক। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গার ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা প্রধান ষড়যন্ত্রকারী হওয়া এবং সহিংস উপায়ে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা। অথচ বিস্ময়করভাবে দাঙ্গার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন।
৩৮ বছর বয়সী এই অধিকারকর্মী তাঁর সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ ছয় বছরের এই বিচ্ছিন্ন জীবন তাঁর মন ও শরীরের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। উমর বলেন, “যখন একজন মানুষকে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা হয়, তখন তাঁর মানবিক সত্তা হারিয়ে যায়। সমাজ ভুলে যায় যে আমারও দুর্বলতা ও ভয় আছে। এমনকি জেলের ভেতরেও যখন সহবন্দীরা আমাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে ফিসফাস করে, তখন উপলব্ধি করি যে প্রচার-প্রপাগান্ডা কীভাবে একজন মানুষকে অমানবিক করে তোলে।” তবে এতকিছুর পরও মোদি সরকারের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ নিয়ে তাঁর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি ভারতে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ‘হেট স্পিচ’-এর সামাজিক বৈধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) এই পিএইচডি গবেষক ২০১৬ সালে প্রথমবার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। ২০১৯ সালে বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে বিশাল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, উমর ছিলেন তার অন্যতম প্রধান সংগঠক। অথচ সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাশুল তাঁকে দিতে হচ্ছে দীর্ঘ কারাবাসের মাধ্যমে। সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির পক্ষ থেকে উমরকে সংহতি জানিয়ে লেখা চিঠি ভারত সরকারের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। যদিও বিজেপি দাবি করে আসছে যে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন, কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিচার শুরু না হওয়া এবং বারবার জামিন নামঞ্জুর হওয়া এক ভিন্ন সত্যকেই ইঙ্গিত করছে।
কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে উমর এখন মুক্তির প্রহর গুনছেন তাঁর ডায়েরিতে লিখে রাখা প্রিয় উদ্ধৃতিগুলোর মাঝে। চলতি মাসেই তাঁর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লেখা প্রথম বই ‘ফ্র্যাকচার্ড কমিউনিটিজ’ প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। হতাশা আর একাকীত্বের মাঝেও তিনি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন। তিহার জেলের দেওয়ালে তিনি লিখে রেখেছেন ভারতীয় বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের সেই অমর উক্তি— ‘আমি সেই উন্মাদ আত্মা, যে বন্দিদশাতেও মুক্ত।’
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।