বিশ্ব ফুটবলের মহাকুম্ভ ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ’ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু এই টুর্নামেন্টের উন্মাদনা মেক্সিকোর শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত শুক্রবার মেক্সিকোর শিক্ষামন্ত্রী মারিও ডেলগাডো এক আকস্মিক ঘোষণায় জানিয়েছেন, এবারের শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪০ দিন আগেই অর্থাৎ ৫ জুনের মধ্যে শেষ করা হবে। সাধারণত মেক্সিকোতে জুনের শেষ নাগাদ ক্লাস চললেও এবার বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এবং দেশটির কয়েকটি রাজ্যে চলমান তীব্র ‘হিটওয়েভ’ বা তাপপ্রবাহকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে এই দীর্ঘ ছুটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী ডেলগাডো উত্তরাঞ্চলীয় সোনোরা রাজ্যে এক জনসভায় বলেন, “আমরা ৫ জুনের মধ্যে স্কুলগুলোর পাঠদান সম্পন্ন করতে চাইছি। একদিকে বিশ্বকাপে আয়োজক হিসেবে আমাদের বিশাল কর্মযজ্ঞ রয়েছে, অন্যদিকে অসহনীয় গরম শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগামী শিক্ষাবর্ষের ক্লাস বর্তমানের ৩১ আগস্টের পরিবর্তে কিছুটা এগিয়ে আনা হতে পারে। উল্লেখ্য, আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে এই যৌথ আয়োজনের বিশ্বকাপ।
তবে সরকারের এই ঘোষণা দেশটির অভিভাবক মহলে বজ্রপাতের মতো আঘাত হেনেছে। কর্মজীবী মায়েরা চরম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন কারণ টানা তিন মাসের লম্বা ছুটিতে সন্তানদের দেখাশোনার জন্য তাঁদের যেমন বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে, তেমনি গুনতে হবে মোটা অংকের বাড়তি খরচ। অভিভাবকদের মতে, বিশ্বকাপের দোহাই দিয়ে পড়াশোনার ওপর এই হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মেক্সিকোর পাবলিক পলিসি থিঙ্কট্যাংক ‘মেক্সিকো ইভালুয়া’র একটি প্রতিবেদন। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে মেক্সিকোর প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ শিক্ষার্থী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ‘লার্নিং গ্যাপ’ বা শেখার ঘাটতি যেমন বাড়বে, তেমনি ধনী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য আরও প্রকট হবে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ‘কোপারমেক্স’ (COPARMEX) এই সিদ্ধান্তকে অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খল বলে আখ্যায়িত করেছে।
রাজনৈতিকভাবেও মেক্সিকো এখন এই ইস্যুতে বিভক্ত। শিক্ষামন্ত্রী একতরফা ঘোষণা দিলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এটি এখনও একটি ‘প্রস্তাব’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত কোনো ‘ডেডলাইন’ নির্ধারিত হয়নি। প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, ফুটবল আনন্দ দিলেও শিশুরা যাতে পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, সেটিই হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
এদিকে, মেক্সিকোর বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য জালিসকো সরাসরি এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই রাজ্যের কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশনা মানবেন না এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ৩০ জুন পর্যন্ত স্কুল খোলা রাখবেন। তবে ওই রাজ্যের অন্যতম আয়োজক শহর গুয়াদালাহারায় যখন বিশ্বকাপের চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, কেবল সেই চার দিন বিশেষ নিরাপত্তামূলক কারণে স্কুল বন্ধ রাখা হবে। বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার আগেই মেক্সিকোর রাজপথ আর স্কুল প্রাঙ্গণে চলা এই বিতর্ক এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।