পৃথিবী এখন ‘গুরুতর অসুস্থ রোগী’, ২০৩০ সালেই কি মহাবিপর্যয়? বিজ্ঞানীদের ভয়ংকর হুঁশিয়ারি

মানবসভ্যতা এক চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সূচকগুলো এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্যসহ বিশ্বের ৭০ জনের বেশি শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় এক ভয়াবহ অশনিসংকেত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর নিছক পূর্বাভাস নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। একই সঙ্গে তাঁরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তিশালী দেশে জলবায়ু পর্যবেক্ষণ খাতের ‘বাজেট’ বা অর্থায়নে কাটছাঁট করার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলার বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাগুলো মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

বিখ্যাত ‘আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই উষ্ণতার প্রায় পুরোটাই (১.৩৭ ডিগ্রি) মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাসের ফল। গবেষণার সহ-লেখক আয়ারল্যান্ডের মেয়নুথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার থর্ন বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, “আমাদের পৃথিবী এখন একজন অত্যন্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীর মতো, যার শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।” তিনি তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়ার এই প্রবণতাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বিশ্ব এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাপ সঞ্চয় করছে, যার ফলে ‘পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা’ চরমে পৌঁছেছে। এর সহজ অর্থ হলো, সূর্যের যে পরিমাণ তাপ পৃথিবীতে প্রবেশ করছে, গ্রিনহাউস গ্যাস ও দূষণরোধী ধূলিকণা বা অ্যারোসলের অভাবে তার সিংহভাগই মহাকাশে ফিরে যেতে পারছে না। ফলে পৃথিবীর ভেতরেই তাপ আটকে থেকে বিশ্বকে দ্রুত উত্তপ্ত করে তুলছে। গবেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যেই পৃথিবী ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই ভয়ংকর সীমা ছুঁয়ে ফেলবে, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি হাতে থাকা ‘কার্বন বাজেট’ বা নিরাপদ কার্বন নিঃসরণের কোটা আগামী মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

এই মহাজাগতিক সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে সমুদ্রে। ১৯০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার বা ৯ ইঞ্চি বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি বছর ৩.৮৪ মিলিমিটার হারে পানি বাড়ছে, যা উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। এ ছাড়া ১৯৯১ সালের তুলনায় সমুদ্রে তীব্র তাপপ্রবাহের হার তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমুদ্রের পানি বছরে গড়ে ৬৫ দিন তীব্র গরম বা ‘হিটওয়েভ’-এর কবলে থাকছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তবে বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জলবায়ু নীতি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি সমুদ্রের গভীর থেকে কয়েক শ অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণযন্ত্র বা ‘সেন্সর’ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস’-এর কর্মকর্তা সামান্থা বার্গেস বলেন, এই যন্ত্রগুলো সমুদ্রের তাপ শোষণ ও স্রোত পরিবর্তনের তথ্য সংগ্রহের জন্য অপরিহার্য ছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বাজেট সংকোচনকে কেন্দ্র করে জলবায়ু রক্ষার লড়াই থেকে উন্নত দেশগুলোর এই পিছু হটা মানবজাতির জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।