নিজ দলের বিদ্রোহে কোণঠাসা ট্রাম্প? ইরানে নতুন আক্রমণের ক্ষমতা কেড়ে নিতে কংগ্রেসে নয়া সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক প্রবল ক্ষমতার লড়াই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাতে নিজ ক্ষমতাবলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা হামলা চালাতে না পারেন, সেজন্য তাঁর যুদ্ধকালীন ক্ষমতার ওপর আইনি শিকল পরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মার্কিন পার্লামেন্ট। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘প্রতিনিধি পরিষদ’-এ (House of Representatives) এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ট্রাম্পের ‘আগ্রাসী’ পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে আইনসভার একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।

চরম নাটকীয়তাপূর্ণ এই ভোটাভুটিতে বিলটি ২১৫–২০৮ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির চারজন প্রভাবশালী সদস্য দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তার পর থেকে এটি ছিল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাসে কংগ্রেসের চতুর্থ দফার প্রচেষ্টা। এই বিলের মূল লক্ষ্য হলো—কংগ্রেসের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া হোয়াইট হাউস যেন একক সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় ধরনের সংঘাত বা সহিংসতা উসকে দিতে না পারে।

প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া এই বিলটি এখন উচ্চকক্ষ সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও সিনেট বর্তমানে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ, তবুও জনমতের চাপে সেখানেও বিলটি নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে আইনটি চূড়ান্ত রূপ পেলেও ট্রাম্পের সামরিক পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিলের বিরুদ্ধে নিজের ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে বিলটি কার্যকর করতে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে, যা বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।

রিপাবলিকান শিবির থেকে বিদ্রোহ করা চার কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি, ব্রায়ান ফিৎজপ্যাট্রিক, টম ব্যারেট ও ওয়ারেন ডেভিডসনের ভূমিকা এখন ওয়াশিংটনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মিশিগানের রিপাবলিকান সদস্য টম ব্যারেট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, “আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী একমাত্র কংগ্রেসই যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার রাখে। এটি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় যেখানে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।” প্রেসিডেন্টের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি নিজের বিবেকের তাড়নায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা এই ভোটাভুটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির শীর্ষ প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ ও ব্যয়বহুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্টের একগুঁয়েমির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই বিলটি পাস হওয়ার মাধ্যমে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলো বলে মনে করছেন তিনি।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল বাড়ছে, তখন ওয়াশিংটনের এই আইনি লড়াই বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।