মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে উপনীত হয়েছে। গত রোববার গভীর রাতে এই দুই দেশের মধ্যকার বিশেষ মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। তবে এই শান্তিবার্তায় স্বস্তির বদলে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং চরম অনিশ্চয়তা। খোদ ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা ওয়াশিংটনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তান। এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষ ভূমিতে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে ‘সম্পূর্ণ’ বলে অভিহিত করলেও ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত দলিলে সই হবে।
তবে এই শান্তিচুক্তির মূল শর্তগুলো, বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি সপাটে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। তেল আবিবের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা এই চুক্তির শর্ত মানতে কোনোভাবেই আইনত বাধ্য নন। এই ঘোষণার পরপরই সোমবার দক্ষিণ লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট’-এর দাবি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, লেবানন ইস্যুতে ইরানের কোনো শর্তই তাঁরা মেনে নেবেন না। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার তথাকথিত নিরাপত্তা বলয়গুলোতে অবস্থান করবে এবং প্রয়োজনে বেসামরিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
চুক্তিটি নিয়ে সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই চুক্তিকে ‘মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর’ এবং ‘বিপর্যয়কর আত্মসমর্পণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, “ইসরায়েল আমেরিকার কোনো ‘বানানা রিপাবলিক’ বা পুতুল রাষ্ট্র নয়। ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।” সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ইরানের ওপর এমন তীব্র আঘাত হানা হবে যে তাঁরা কেবল হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং মাথা নত করতেও বাধ্য হবেন।
এদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তিটি বড় ধরনের ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক ইনন মাগাল সরাসরি ট্রাম্পকে ‘পরাজিত ব্যক্তি’ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারকে আক্রমণ করে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইডিএসএফ (IDSF) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই ব্যর্থ হতে বাধ্য। একই সঙ্গে দেশটির বিরোধী দলীয় নেতারা এই সুযোগে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বকে ‘দুর্বল ও প্রভাবহীন’ বলে কটাক্ষ করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও বিরোধী নেতা ইয়ায়র গোলান দাবি করেছেন, নেতানিয়াহুর ভুল নীতির কারণেই আজ ইসরায়েলকে এই চরম কূটনৈতিক অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানের পথ দেখাবে, নাকি ইসরায়েলের একগুঁয়েমিতে অঞ্চলটি আরও ভয়াবহ এক সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে—তা এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।