দীর্ঘ ১১ সপ্তাহের বিধ্বংসী সংঘাত আর মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলা করে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকে গেলেও, দেশটির শাসকদের সামনে এখন আরও ভয়াবহ এক ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’ অপেক্ষা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, রণাঙ্গনের বারুদ থিতিয়ে আসার সাথে সাথেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন মেরুকরণ। একদিকে যুদ্ধে টিকে যাওয়ার সাফল্যে উজ্জীবিত কট্টরপন্থীদের আকাশচুম্বী দাবিদাওয়া, আর অন্যদিকে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় পিষ্ট সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—এই দুই বিপরীতমুখী চাপের মুখে তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এখন এক কঠিন গোলকধাঁধায়।
আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে সাময়িক স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা থাকলেও, ইরানের ভেতরে শুরু হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে প্রভাবশালী ‘পেদারি ফ্রন্ট’ মনে করছে যে, এই চুক্তি আসলে এক ধরনের ‘বিপর্যয়কর আত্মসমর্পণ’। তাঁদের দাবি, যে শত্রু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘শহীদ’ করেছে, তাদের সাথে হাত মেলানো ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের পরিপন্থী। বাসিজ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এই ক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যারা এখন ইমামের ‘রক্তের প্রতিশোধ’ নেওয়ার দাবি তুলছেন।
অন্যদিকে, ইরানের সাধারণ মানুষ এখন ক্লান্ত এবং বিপর্যস্ত। বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব এখন রেকর্ড উচ্চতায়। সাধারণ জনগণের একমাত্র প্রত্যাশা হলো—বিদেশে আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত হওয়ার মাধ্যমে যে ‘আর্থিক স্বস্তি’ আসবে, তা যেন সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এবং ভেঙে পড়া অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় করা হয়। এই প্রত্যাশা পূরণ না হলে গত জানুয়ারির মতো আবারও বড় ধরনের গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দমন করা সরকারের জন্য এবার অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ফেলো হামিদরেজা আজিজি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তী চুক্তির ভিত্তি যেহেতু অত্যন্ত নড়বড়ে, তাই প্রকৃত সমস্যাগুলো শুরু হবে চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর থেকেই।’ ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে এক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধের কারণে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা সারাতে বিপুল পরিমাণ ‘বাজেট’ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু কট্টরপন্থীরা চায় সেই অর্থ পুনরায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যয় করতে, যা জনগণের চাহিদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
রাজনৈতিকভাবেও ইরান এক ক্রান্তিকাল পার করছে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনার প্রক্রিয়ায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রভাব আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইআরজিসি টিকে থাকার স্বার্থে এই চুক্তি মেনে নিলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাঁরা থাকবে চরম কঠোর। অর্থাৎ, নারীরা হয়তো হিজাব বা পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা পেতে পারেন, কিন্তু শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো যেকোনো ভিন্নমত কঠোর হস্তে দমন করা হবে। সব মিলিয়ে, শুক্রবারের সেই চুক্তির টেবিল থেকে ইরানের জন্য শান্তি আসবে না কি নতুন কোনো অভ্যন্তরীণ ঝড়ের সংকেত, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির বড় প্রশ্ন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।