ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ও স্পর্শকাতর কেন্দ্রবিন্দু অযোধ্যার রাম মন্দিরকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর বিতর্ক। বাবরি মসজিদের জায়গায় নির্মিত এই মন্দিরে হিন্দু ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ভয়াবহ ঝড় তুলেছে। বিষয়টি এখন আর কেবল সাধারণ চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং আম আদমি পার্টির (আপ) মতো বিরোধী দলগুলো এই ‘মেগা প্রজেক্ট’-এর নেপথ্যে থাকা দুর্নীতির পাহাড় নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে আঙুল তুলেছে।
উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার এই জালিয়াতির তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করলেও ক্ষোভ কমছে না। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির শাসন আজ দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখানে আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) হওয়ার বদলে কেবল এসআইটি গঠন করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।” সমাজবাদী পার্টিই প্রথম জনসমক্ষে মন্দিরের দানবাক্সের টাকা তছরুপের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে এবং দাবি করে যে, অপরাধীরা খোদ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট।
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এই ঘটনাকে ‘আস্থার ডাকাতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ‘দৈনিক ভাস্কর’ পত্রিকার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কংগ্রেস দাবি করেছে, মন্দিরের ট্রাস্টের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে অন্তত ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোটি কোটি হিন্দু ভক্তের আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেলা করা বিজেপি ও আরএসএসের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করে দিয়েছে। একই সুরে আম আদমি পার্টির সাংসদ সঞ্জয় সিং অভিযোগ তুলেছেন যে, মন্দিরের অন্তত ৫০ জন কর্মী এই জালিয়াতির সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি বর্তমান ট্রাস্ট ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
তদন্তে উঠে আসছে এক গভীর ‘পলিটিক্যাল’ বা রাজনৈতিক যোগসূত্র। ২০২০ সালে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য যে ‘স্বাধীন’ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল, তার নিয়ন্ত্রণ ছিল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে। ট্রাস্টের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সরকারের মনোনীত। ফলে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের দায় মোদি প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অযোধ্যা শহরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগানো পোস্টারগুলো তড়িঘড়ি করে সরিয়ে ফেলার ঘটনায় সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বিজেপির ভেতর থেকেই। এক সময়ের কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা এবং বজরং দলের প্রতিষ্ঠাতা বিনয় কাটিয়ার এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এই নেতা বর্তমানে কোণঠাসা হয়ে আছেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি সরাসরি বর্তমান মন্দির কমিটির সদস্যদের ‘চোর’ বলে অভিহিত করে বলেন, “এখানে যারা নেতৃত্বে আছে, তারা সবাই চোর।” কাটিয়ারের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যোগী ও মোদি শিবিরের জন্য বড় ধরনের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়াধ অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী আবেগের মেরুকরণ যখন মন্দিরের দুর্নীতির কারণে প্রশ্নের মুখে, তখন এই রাজনৈতিক ফাটল গেরুয়া শিবিরের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।