৭০ শতাংশ মন্ত্রীই ব্যবসায়ী: নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে এই ‘কর্পোরেট’ ক্যাবিনেট?

৭০ শতাংশ মন্ত্রীই ব্যবসায়ী: নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে এই ‘কর্পোরেট’ ক্যাবিনেট?

 ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে বড় ধরনের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ী শ্রেণির। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার ৫০ সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই পেশায় ব্যবসায়ী, যা শতাংশের হিসেবে মোট মন্ত্রিপরিষদের ৭০ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত হলফনামা পর্যালোচনা করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।


নতুন এই ক্যাবিনেটে ১৯ জন মন্ত্রী এবং ১৬ জন প্রতিমন্ত্রী তাদের প্রধান পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসায়ীদের পর এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন আইনজীবীরা। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মন্ত্রিসভার বিশাল এই বহরে নিজেদের ‘পেশাদার রাজনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন মাত্র দুজন। তারা হলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বাকি সদস্যদের প্রায় সবাই দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও হলফনামায় বিকল্প পেশার দিকেই পাল্লা ভারী ছিল।


ব্যবসা ও রাজনীতির এই মিশেলে প্রভাবশালী অনেক নাম উঠে এসেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের মতো হেভিওয়েট নেতারা পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা জানিয়েছেন। একইভাবে আব্দুল আউয়াল মিন্টু, হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এবং মিজানুর রহমান মিনুর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরাও নিজেদের ব্যবসায়ী হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।


প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যেও ১৬ জনই ব্যবসায়িক খাতের প্রতিনিধি। এদের মধ্যে শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ইশরাক হোসেন এবং নুরুল হক নুরদের মতো কনিষ্ঠ সদস্যরাও রয়েছেন। বিশেষত, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ নিজের পেশা শিক্ষকতা বললেও ‘ডেটকো প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘জ্ঞানী আইটি’র মতো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্বে থাকার তথ্য দিয়েছেন।


পেশাগত বৈচিত্র্যে আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালের মতো অন্তত ৬ জন সদস্য। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং এম এ মুহিত। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান পেশাদার কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে মন্ত্রিসভায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন।


মন্ত্রিসভায় ব্যবসায়ীদের এই ব্যাপক উপস্থিতিকে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যেন ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য না পায়, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অন্যথায় সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”


তবে এই সমীকরণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, ব্যবসায়ীরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকলে বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা মোকাবিলা করা সহজ হবে।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে ব্যবসায়ীদের হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালে ৩৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এবার সেই ধারা আরও শক্তিশালী হয়ে ৫৯ শতাংশ সংসদ সদস্যই ব্যবসায়ী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নতুন এই মন্ত্রিসভায়।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।