ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংবাদ প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার ব্যয় নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচনের সময় বিটিভির রাতের খবরে প্রচারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য ছিল, যেখানে বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল বিএনপি ও জামায়াত।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে আনা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বিটিভির প্রচারণার খতিয়ান ও আর্থিক মূল্য: টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিটিভির রাত ৮টার প্রধান সংবাদে নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রমে মোট ৫৯৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড সময় ব্যয় করা হয়েছে। এই প্রচারণার প্রাক্কলিত আর্থিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে এককভাবে বিএনপি পেয়েছে ৩৫২ মিনিট ১৫ সেকেন্ড (৫৯.৩২ শতাংশ), যার আর্থিক মূল্য ৩ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা। জামায়াতে ইসলামীর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ১২৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড (২১.৫৯ শতাংশ), যার বাজারমূল্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৭০ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড। তবে বিস্ময়করভাবে জাতীয় পার্টির (জাপা) জন্য বিটিভি এক সেকেন্ড সময়ও বরাদ্দ করেনি।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণার ব্যয়: নির্বাচনী প্রচারণায় পিছিয়ে ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও। টিআইবি জানায়, গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি তাদের ১১টি দলীয় ও ১১টি প্রার্থীর পেজ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে জামায়াত ১১৫টি পেজের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৩৬০ টাকা এবং এনসিপি ১৭টি পেজে ১০ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ টাকা খরচ করেছে।
সংসদ সদস্যদের প্রোফাইল: নবগঠিত সংসদের চালচিত্র বিশ্লেষণ করে টিআইবি জানিয়েছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গড় বয়স ৫৯ বছর এবং এবার ২০৯ জন নতুন মুখ সংসদে যাচ্ছেন। বিজয়ীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৮৩ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও তদূর্ধ্ব)। তবে পেশার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য স্পষ্ট; নির্বাচিতদের প্রায় ৬০ শতাংশই পেশায় ব্যবসায়ী। এছাড়া আইন পেশা থেকে ১১.৮ শতাংশ এবং শিক্ষকতা পেশা থেকে এসেছেন ৮.১ শতাংশ সদস্য। প্রতিবেদনে আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে যে, প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।
প্রচারণা ও কর্মকর্তাদের অনিয়ম: নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্রও ফুটে উঠেছে এই প্রতিবেদনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারীরাও সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন, এমনকি অনেকে গান ও গজল গেয়ে প্রচার চালিয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের নামে বিতর্কিত বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে টিআইবি। মাঠপর্যায়ে পোলিং ও প্রিসাইডিং অফিসারদের একাংশ নির্বাচনের আগের রাতে প্রতিপক্ষের নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক, আপ্যায়ন গ্রহণ এবং ব্যালটে আগেভাগে স্বাক্ষর বা সিল মারার মতো জালিয়াতিতে লিপ্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।