লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার হাজার হাজার মানুষের জন্য এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘স্বপ্নযাত্রা’ নামের নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু উদ্বোধনের চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেটি এক দিনের জন্যও কোনো মুমূর্ষু রোগীর উপকারে আসেনি। বর্তমানে উপজেলার আলেকজান্ডার বাজার সংলগ্ন সেন্টার খালের পাড়ে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থেকে কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে এই নৌযানটি। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ তদারকি আর সদিচ্ছার অভাবে অ্যাম্বুলেন্সটির মূল্যবান ইঞ্জিন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে।
২০২২ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে এই নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি কেনা হয়েছিল। নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এই জনপদে এটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য পরম প্রত্যাশার। তবে উদ্বোধনের পর থেকেই কোনো চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে সেটি আর সচল হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো তদারকি না থাকায় ধাপে ধাপে এর প্রতিটি কলকবজা খোয়া গেছে। বর্তমানে এটি কেবলই একটি মরিচা ধরা জরাজীর্ণ কাঠামো হিসেবে খালের পাড়ে পড়ে আছে।
রামগতির চর আবদুল্লাহ ও চরগজারিয়া ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী চরাঞ্চলগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ নৌপথনির্ভর। বর্ষা মৌসুমে যখন নদীর ঢেউ উত্তাল হয়ে ওঠে, তখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের যাতায়াতও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডে আসার জন্য একমাত্র ভরসা ট্রলার, যার ভাড়া গুণতে হয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে এই বিপুল অর্থ ব্যয় ও ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষ রেহাই পেতেন।
এই চরম অব্যবস্থাপনার একটি করুণ চিত্র ফুটে ওঠে গত ৮ এপ্রিল। ওইদিন সকালে চর আবদুল্লাহর শিশু মো. মামুন পেটের তীব্র ব্যথায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো যান খুঁজে পায়নি পরিবারটি। শেষ পর্যন্ত একটি ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। মামুনের বাবা জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি কখনোই মানুষের কাজে আসেনি। এক দিনের জন্যও এটি কোনো রোগী বহন করতে দেখলাম না।”
চর আবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু জানান, চালক সংকটসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে শুরু থেকেই এই সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে দুর্গম অঞ্চলের মানুষ তাদের মৌলিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, শুরুতে এটি অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার না হয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রমোদভ্রমণে ব্যবহৃত হতো। পরে বিতর্ক এড়াতে সেটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় খালে ফেলে রাখা হয়।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেন দীর্ঘ সময় এটি ব্যবহার করা হয়নি, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।