ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ ১৮ মাস অতিবাহিত হয়েছে। তবে এই সুদীর্ঘ সময়ে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একবারের জন্যও সরাসরি গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে কোনো প্রশ্নোত্তরে অংশ নেননি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই নজিরবিহীন চিত্রটি ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে গণমাধ্যম পাড়ায় তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
প্রধান উপদেষ্টার এমন নিভৃতে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি জানান, উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা সাধারণত সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন না এবং এটাই বর্তমানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। মূলত প্রেস উইংয়ের মাধ্যমেই সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থান গণমাধ্যমকে জানানো হয় এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন কৌতূহল বা প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর ১৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির ঢাকা ব্যুরো প্রধান শফিকুল আলমকে প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই শক্তিশালী প্রেস উইংয়ে উপ-প্রেস সচিব হিসেবে কাজ করছেন আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর। এছাড়াও জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ এবং সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে সুচিস্মিতা তিথি ও নাঈম আলী নিরলসভাবে তথ্য সরবরাহের কাজ করে যাচ্ছেন।
বিগত ১৮ মাসে প্রেস উইংয়ের কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন নিয়মিত ‘প্রেস ব্রিফিং’ (Press Briefing) আয়োজন করা হয়েছে। কখনও কখনও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার বাইরে থেকেও বিশেষ ব্রিফিং ডাকা হয়েছে। এসব সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। মূলত শফিকুল আলম ও আবুল কালাম আজাদ মজুমদারই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও সরকারের চলমান কার্যক্রম সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি ‘হোয়াটসঅ্যাপ’ (WhatsApp) গ্রুপ এবং ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমেও তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রধান উপদেষ্টার বিভিন্ন অনুষ্ঠান কাভার করার জন্য পুলিশের বিশেষ শাখার কড়া যাচাই-বাছাই শেষে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাংবাদিককে বিশেষ ‘পাস’ (Pass) দেওয়া হলেও, তাদের কারোই সরাসরি প্রধান উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ ছিল না। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন কাভার করা পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। অনেক সাংবাদিক আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রধান কারিগরের সাথে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ না থাকাটা তাদের জন্য একটি অতৃপ্তি হয়েই থাকবে।
যদিও প্রেস সচিব বারবারই উন্নত বিশ্বের ‘গ্লোবাল প্র্যাকটিস’ (Global Practice) এবং বিদেশি ভিভিআইপি সফরের সময়কার প্রথার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তবুও দায়িত্ব ছাড়ার আগে প্রধান উপদেষ্টা অন্তত একদিনের জন্য হলেও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের সাংবাদিক সমাজ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।