করোনা মহামারি এবং তৎপরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চরম আর্থিক দুরবস্থা ও মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। একদিকে কাজ হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম-সব মিলিয়ে দিশেহারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। দেশে চলমান প্রায় ১০০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থাকলেও ওভারল্যাপিং (কাজের পুনরাবৃত্তি), দ্বৈততা এবং সুবিধাভোগী বাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছেন। এমন এক জটিল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দিতে এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার।
আগামী ১০ মার্চ থেকে দেশব্যাপী পরীক্ষামূলকভাবে বা পাইলটিং আকারে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার শুরু থেকেই বিএনপি এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রধান প্রতিশ্রুতির একেবারেই শুরুতে স্থান পেয়েছিল এই মেগা প্রকল্পটি। ইশতেহার অনুযায়ী, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই অর্থসেবার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে আরও বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
কোথায় কোথায় চলছে পাইলটিং? ইতোমধ্যেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে দিশারী বা পাইলটিং প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। দেশের মোট ১৪টি নির্বাচিত স্থানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এলাকাগুলো হলো-রাজধানীর কড়াইল বস্তি ও ভাষানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।
প্রাথমিকভাবে নেওয়া এই পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে চার সদস্যের একটি ওয়ার্ড কমিটি অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের জরিপ এবং ডেটা এন্ট্রির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে, আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শেষে নির্ধারিত ১০ মার্চেই সুনামগঞ্জে এই কর্মসূচির শুভ সূচনা করা সম্ভব হবে।
একই চিত্র বান্দরবান জেলার লামা উপজেলাতেও। বান্দরবান জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মিল্টন মুহুরি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের এলাকায় মাঠপর্যায়ের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণের জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশেই জরিপ ও ডেটা এন্ট্রির কাজ একেবারে শেষ ধাপে রয়েছে। আগামী ৯ মার্চের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণের কাজ শেষ হবে। এরপর ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ওই দিনই প্রথমবারের মতো সুবিধাভোগীদের মুঠোফোনে সরাসরি নগদ সহায়তার অর্থ পৌঁছে যাবে।
কারা পাবেন এই কার্ড এবং কীভাবে পরিচালিত হবে? সরকারি নীতিপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই ফ্যামিলি কার্ডটি মূলত একটি একীভূত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এর আগে ব্রাজিল, ভারত ও ইন্দোনেশিয়াতেও এ ধরনের পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে, যা সেসব দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে।
গত সপ্তাহে সচিবালয়ে প্রথম আলোর সাথে আলাপকালে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে থাকবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে এর সঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ এবং পরিকল্পনাসহ সরকারের মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমরা পাইলটিং শুরু করছি। একপর্যায়ে দেশের সব পরিবার এই কার্ড পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবার।’
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরিবারে থাকা মা অথবা নারীপ্রধানের নামেই সরকার এই কার্ড ইস্যু করবে। কার্ডধারীর বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। এই স্মার্ট কার্ডটিতে একজন নাগরিকের যাবতীয় তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডটিকে একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর করা।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, সুবিধাভোগী নির্বাচনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করা হবে না। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ডেটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে পরিবারের শ্রেণি (উচ্চ বা নিম্নবিত্ত) নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যসংবলিত পরিবার, নারীপ্রধান পরিবার এবং সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী (যেমন- হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) আর্থিক বা খাদ্যপণ্য সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে।
তদারকি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ পুরো কর্মসূচিটি স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ স্তরবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে—ওয়ার্ড কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি, পৌর বা শহর কমিটি এবং উপজেলা কমিটি। এই সকল কাঠামোর ওপরে তদারকির দায়িত্বে থাকবে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি, যার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রী এবং সদস্যসচিব থাকবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। এছাড়া কারিগরি দিক সামলাতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কারিগরি ও ডেটা ম্যানেজমেন্ট কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
তবে এত বড় একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা যে ছয়টি কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, তার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড অন্যতম। প্রাথমিকভাবে চার মাসের জন্য নেওয়া এই পাইলট প্রকল্পে ৪০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে, নগদ অর্থ সহায়তা বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে। এটি সামাল দিতে অর্থনীতিতে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ বৃদ্ধি করা জরুরি। এছাড়া অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষের কারণে বাজেট ঘাটতিও বাড়তে পারে। এই ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ধাপে ধাপে প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য খাতের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও একক ধারার সুবিধা বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, দেশে চলমান সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি ও পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। প্রকৃত প্রাপকরা অনেক সময় তালিকা থেকে বাদ পড়েন, আবার দুর্নীতিগ্রস্তরা একই সাথে একাধিক সুবিধা ভোগ করেন। ফ্যামিলি কার্ড চালুর মাধ্যমে এই ওভারল্যাপিং দূর হবে এবং সম্পদের ব্যাপক অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং স্বনামধন্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রথম আলোকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, দেশে ২৫টির মতো মন্ত্রণালয় প্রায় ১০০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, যেখানে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড এই বিশাল খাতটিকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশব্যাপী এই কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হতে পারে, যার সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যয়ও যুক্ত হবে। ফলে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে নীতিনির্ধারকদের মূল ফোকাস হলো নারীর ক্ষমতায়ন। সরকারের শীর্ষ মহল বিশ্বাস করে, নগদ টাকা হোক বা খাদ্যপণ্য-সবকিছু যখন সরাসরি নারীর হাতে যাবে, তখন পরিবারে সঞ্চয় বাড়বে। আর এই স্বাধীন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সঞ্চয়ই সমাজে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।