আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে, ঠিক তখনই এক চিলতে অলৌকিক আশার পেছনে দিনভর হন্যে হয়ে ছুটল এক শোকাতুর পরিবার। সাপের কামড়ে প্রাণ হারানো এক যুবকের নিথর দেহ দাফন না করে বাড়ির উঠানে ফেলে রেখে দিনভর চলল ওঝা ও সাপুড়েদের ঝাড়ফুঁক। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের রাজমাথা এলাকায়।
নিহত যুবকের নাম এইচএম সায়েম (২৭)। তিনি ওই এলাকার মৃত সৈয়দ হাওলাদারের ছেলে এবং পেশায় একজন কাভার্ডভ্যান চালক ছিলেন। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করার পর থেকেই শুরু হয় এক অদ্ভুত নাটকীয়তা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিদিনের মতো নিজের পেশাগত কাজ শেষে কাভার্ডভ্যানটি নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিং করে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন সায়েম। পথিমধ্যে চাঁদপাশা ও রহমতপুর ইউনিয়নের সংযোগস্থল ‘ভাঙ্গা বুনিয়া খাল’ এলাকায় পৌঁছালে একটি বিষধর সাপ তাকে দংশন করে। কোনোমতে বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেও দ্রুতই তার শরীরে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি সংজ্ঞা হারান। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ‘এন্টিভেনম’ (Antivenom) প্রয়োগ করেন। পরপর দুইবার জীবনরক্ষাকারী এই ইনজেকশন দেওয়া হলেও সায়েমের জ্ঞান ফেরেনি। অবশেষে শুক্রবার সকালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
তবে চিকিৎসকদের ঘোষণায় মন সায় দেয়নি শোকবিহ্বল স্বজনদের। তাদের বিশ্বাস ছিল, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় হয়তো অলৌকিক কোনো উপায়ে সায়েম আবার জীবিত হয়ে উঠবেন। এই অটল বিশ্বাস থেকেই দাফন প্রক্রিয়া স্থগিত করে সায়েমের মরদেহ বাড়ির উঠানে রাখা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে খবর দিয়ে আনা হয় নামকরা সব ওঝা ও সাপুড়েদের। দিনভর সাপুড়েদের মন্ত্র আর ওঝাদের বিরামহীন ঝাড়ফুঁক দেখতে ভিড় জমান কয়েকশ উৎসুক মানুষ। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে চরম কৌতূহল ও উদ্বেগ।
বিকেল ৩টা পর্যন্ত সাপুড়েরা সায়েমের দেহে প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা চালালেও কোনো সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ওঝারাও হার মেনে তাকে চূড়ান্তভাবে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সায়েমের স্বজন মো. জুয়েল হোসেন বলেন, “চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করলেও আমাদের আশা ছিল অলৌকিক কিছুর। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে আমরা শেষ চেষ্টা চালিয়েছি।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য হালিম হাওলাদার এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোক প্রকাশ করে বলেন, “সায়েম তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার ২ বছরের একটি শিশু কন্যা, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা রয়েছে। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়েছে।” দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি শেষে আসরের নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে সায়েমকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া