রাজধানীর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তদন্তকারী সংস্থাকে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার নির্ধারিত দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম নতুন এই তারিখ ধার্য করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ৬ জানুয়ারি এই মামলার প্রাথমিক তদন্ত শেষে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে একটি অভিযোগপত্র বা ‘চার্জশিট’ দাখিল করেছিল। তবে সেই তদন্তে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন জমা দেন। বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত অধিকতর ও পুনঃতদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে।
সিআইডি তদন্তভার গ্রহণ করার পর এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি করিম মাসুদ ওরফে রাহুলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফয়সাল রুবেল আহমেদকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। দুই দফায় মোট ১২ দিনের ‘রিমান্ড’ শেষে আসামি রুবেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যা বর্তমানে মামলার নথিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘এভিডেন্স’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ওসমান হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালীন মোটরসাইকেলে আসা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা তাঁর মৃত্যুর পর দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েক সহযোগীসহ ৫ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। অন্য আসামিরা হলেন—রাহুলের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭), মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)।
পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে গোয়েন্দা পুলিশ উল্লেখ করেছিল যে, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন সিআইডির পুনঃতদন্তে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে নিহতের পরিবার ও দেশবাসী।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।