সুন্দরবন কি আবারও দস্যুদের দখলে? যে তিতকুটে সত্যে পুরোনো পথে ফিরছে আত্মসমর্পণকারীরা

এক সময়ের আতঙ্কের জনপদ সুন্দরবন ২০১৮ সালে দস্যুমুক্ত ঘোষিত হলেও, সাত বছর পার হতে না হতেই সেখানে আবারও অশান্তির ছায়া দেখা দিচ্ছে। পুনর্বাসনের অভাব, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং চরম আর্থিক সংকটে পিষ্ট হয়ে আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবারও পুরোনো অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ব ঐতিহ্য এই ম্যানগ্রোভ বন সংলগ্ন এলাকাগুলো ঘুরে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সাবেক দস্যুদের সঙ্গে কথা বলে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।

২০১৮ সালে যখন সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান জানিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫৯৩ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু সেই শান্তির সুবাতাস এখন ফিকে হতে শুরু করেছে।

রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা এলাকার সাব্বির শেখ, যিনি এক সময় দুর্ধর্ষ ‘জুলফিকার বাহিনী’র নেতৃত্বে ছিলেন, তিনি শোনালেন তার বর্তমান জীবনের টানাপোড়েনের গল্প। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই সাবেক দস্যু বলেন, ‘ডাকাতিতে টাকা থাকলেও শান্তি ছিল না। অভিযানের ভয় আর এলাকাবাসীর লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে আত্মসমর্পণ করেছিলাম। কিন্তু এখন আমরা মামলার জালে বন্দি। সরকারি আশ্বাসের পরও আমার নামে এখনও তিনটি মামলা ঝুলছে। পুনর্বাসনের যা দেওয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। মামলার হাজিরা আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে পৈত্রিক ভিটেমাটিও বিক্রি করতে হয়েছে। এখন ক্ষুধা মেটানোই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ক্ষুধার জ্বালায় অনেকেই আবারও বনে ফিরে যাচ্ছে।’

একই সুর শোনা গেল ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করা কামাল শিকারীর কণ্ঠেও। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ‘র‍্যাব-৬ এর কাছে অস্ত্র জমা দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হবে। অথচ বছরের পর বছর পার হলেও আমরা আদালতের বারান্দায় ঘুরছি। হাজিরা দিতে দিতেই জীবন শেষ। অনেকেই এই অসহ্য যন্ত্রণায় ফের সুন্দরবনে ডাকাতি করতে নেমে গেছে।’ আরেক সাবেক দস্যু সোলাইমানের দাবি, মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা মামলার পেছনে খরচ করা তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে অসম্ভব।

এদিকে, সুন্দরবনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপরতা বাড়িয়েছে কোস্ট গার্ড। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত দেড় বছরে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন গ্রুপের ৬১ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর আওতায় জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চলছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব মনে করেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া টেকসই না হলে এই সংকট মিটবে না। তিনি বলেন, ‘সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তারা যদি কর্মসংস্থান না পায় এবং মামলার চাপে পিষ্ট হয়, তবে অপরাধে ফিরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।’

তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের অবস্থান বেশ কঠোর। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্র বারবার অপরাধীদের সুযোগ দেবে না। তিনি বলেন, ‘অনেকে আত্মসমর্পণের কথা বলছে, কিন্তু আমরা এখন আর আগ্রহ দেখাচ্ছি না। যারা অপরাধ করবে তাদের কঠোর অভিযানের মুখে পড়তে হবে। বনদস্যু দমনে আমাদের অভিযান চলবেই।’

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানিয়েছেন, আত্মসমর্পণের সময় প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন কোনো দাবি থাকলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

বনজীবী ও সাধারণ মানুষের দাবি, সুন্দরবনকে চিরতরে দস্যুমুক্ত রাখতে কেবল শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান ও আইনি জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ তকমাটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া