মেসি-এমবাপ্পের দাপটের মাঝেও অনন্য এক বিস্ময়; ফুটবল বিশ্বকে কী বার্তা দিয়ে বিদায় নিলেন হালান্ড?

ফুটবলের মহাযজ্ঞ বিশ্বকাপ যেমন রোমাঞ্চকর, ঠিক তেমনি নির্মম। এখানে সাফল্যের শিখর ছোঁয়ার পথে এক মুহূর্তের ব্যবধানে নায়ক থেকে কেউ হয়ে যান খলনায়ক। আবার কিছু ট্র্যাজেডি এমন থাকে, যা পরাজয়ের গ্লানি মুছে দিয়ে একজনকে করে তোলে ইতিহাসের অমর অংশ। উত্তর আমেরিকার মাটিতে আয়োজিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা থেমে গেলেও, ফুটবল বিশ্বের হৃদয়ে নিজের নাম চিরস্থায়ীভাবে খোদাই করে নিয়েছেন আর্লিং হালান্ড। ট্রফি জেতা কিংবা ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক ‘গোল্ডেন বুট’ জয় হয়তো ভাগ্যে ছিল না, কিন্তু নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা ফুটবল বোদ্ধাদের কাছে এক বিস্ময়।

রোববার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে নরওয়ে। এই পরাজয়ের সাথেই থেমে গেল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটির রূপকথার মতো পথচলা। একই সাথে ব্যক্তিগত লড়াই থেকেও ছিটকে পড়লেন ২৫ বছর বয়সী হালান্ড। টুর্নামেন্টে তাঁর মোট গোল সংখ্যা ৭টি, যা আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। অথচ সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যে ৮টি করে গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’-এর দৌড়ে এগিয়ে গেছেন। পরিসংখ্যানে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও মাঠের পারফরম্যান্স ও প্রভাবের বিচারে হালান্ডকে ছোট করার কোনো অবকাশ নেই।

নিজের অভিষেক বিশ্বকাপেই হালান্ড বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার বলা হয়। ক্লাব ফুটবলের সেই চেনা ‘নির্ভীক’ রূপ তিনি জাতীয় দলের জার্সিতেও ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিপক্ষের ‘ডিফেন্ডার’দের সাথে তাঁর প্রতিটি লড়াই ছিল যেন কোনো ঝড়ের সাথে পাহাড়ের সংঘর্ষ। অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তি, গতি, উচ্চতা এবং নিখুঁত ‘ফিনিশিং’—এই সবের এক অপূর্ব ‘প্যাকেজ’ ছিলেন তিনি। তাঁর করা সাতটি গোলের প্রতিটিই ছিল ভিন্ন স্বাদের; কোথাও তাঁর অসামান্য ‘হেডার’, কোথাও আবার বিদ্যুতগতিতে রক্ষণভাগ চিরে বল জালে জড়ানোর দক্ষতা।

তবে এই বিশ্বকাপে হালান্ডের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মূলত শেষ ষোলোর সেই অবিস্মরণীয় ম্যাচের জন্য। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে যখন সবাই নরওয়ের বিদায় দেখছিল, তখনই জ্বলে ওঠেন হালান্ড। তাঁর জোড়া গোল কেবল সেলেসাওদের কফিনেই শেষ পেরেক ঠোকেনি, বরং ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে নরওয়ের ফুটবলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ওই একটি ম্যাচই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, হালান্ড একাই যেকোনো রক্ষণভাগকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় প্রথম আসরেই ৭ গোল করার নজির মেলা ভার। মেসি ও এমবাপ্পের মতো মহাতারকাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা এই তরুণ স্ট্রাইকার এখন কেবলই দর্শক। যদি নরওয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে সেমিফাইনালে যেতে পারত, তবে ‘গোল্ডেন বুট’-এর লড়াইয়ের ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতে পারত। তবে নকআউট ফুটবলে দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই। তবুও এই বিদায়ে হালান্ডের জন্য হতাশার চেয়ে গর্বের পাল্লাই ভারী। তিনি বিশ্বকে জানিয়েছেন যে, নরওয়ে এখন আর কোনো মাঝারি সারির দল নয় এবং আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হবে আর্লিং হালান্ড।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।