ভারতীয় বিনোদন জগতের অন্যতম বিতর্কিত রিয়েলিটি শো ‘লক আপ’ তার দ্বিতীয় মৌসুম নিয়ে ফিরেই বাজিমাত করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে স্ট্রিমিং জায়ান্ট ‘নেটফ্লিক্স’-এর অইংরেজি ভাষা বা বিদেশি ভাষার সিরিজের তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে এই শোটি। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে শুরু করে অবদমিত যৌন নির্যাতনের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এই শোয়ের মূল উপজীব্য হওয়ায় দর্শক মহলে এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা। চার বছরের দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে নতুন মোড়কে ফিরে আসা এই শোটি কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষের অন্ধকারতম গোপন অধ্যায়গুলোকে জনসমক্ষে আনার এক দুঃসাহসিক (এবং বিতর্কিত) প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালে প্রযোজক একতা কাপুর যখন প্রথম এই শোটি নিয়ে আসেন, তখন একে ‘ভারতের সবচেয়ে নির্ভীক রিয়েলিটি শো’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় মৌসুমে এসে এর জনপ্রিয়তা এবং বিতর্কের মাত্রা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এবারের মৌসুমের মূল আকর্ষণ হলো এর ‘সাচ ইয়া সাজা’ (সত্য নাকি শাস্তি) নামক বিশেষ থিম। এই নিয়মানুযায়ী, প্রতিযোগীদের টিকে থাকতে হলে ক্যামেরার সামনে এমন কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করতে হয়, যা আগে কখনো কেউ জানত না। যদি কোনো প্রতিযোগী নিজের জীবনের সেই চরম সত্য বলতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁকে বরণ করে নিতে হয় হাড়কাঁপানো ও কঠিন সব ‘সাজা’। মূলত এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই শোটিকে দর্শক মহলে ‘ভাইরাস’-এর মতো জনপ্রিয় করে তুলেছে।
এবারের মৌসুমে সঞ্চালনার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রথম মৌসুমে এককভাবে কঙ্গনা রনৌত দায়িত্ব পালন করলেও এবার মূল সঞ্চালক হিসেবে রয়েছেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ। কঙ্গনা এবার ‘জনতার কণ্ঠ’ হিসেবে বিশেষ পর্বে হাজির হয়ে প্রতিযোগীদের কঠিন সব প্রশ্নের সম্মুখীন করছেন। এবারের প্রতিযোগীদের তালিকাও বেশ চমকপ্রদ। টেলিভিশন অভিনেতা রাম কাপুর, ধীরাজ ধুপার, হর্ষদ চোপড়া ও শিভাঙ্গী জোশিসহ রিয়েলিটি তারকা আকাঙ্ক্ষা চৌধুরী ও যোগেশ রাওয়াতরা নিজেদের ‘চার্জশিট’ নিয়ে লড়ছেন। সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেটার শ্রেয়াস আইয়ারের বোন শ্রেষ্ঠা আইয়ার এই শো থেকে প্রথম প্রতিযোগী হিসেবে বিদায় নিয়েছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে জনপ্রিয়তার সমান্তরালে এই শোটি নৈতিকতার কাঠগড়াতেও দাঁড়িয়েছে। সমালোচক এবং মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের ব্যক্তিগত ট্রমা বা বেদনাকে এভাবে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া এবং বিনোদনের পণ্য বানানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রথম মৌসুমে মুনাওয়ার ফারুকি বা পুনম পাণ্ডের মতো প্রতিযোগীরা যেভাবে নিজেদের জীবনের অন্ধকার দিকগুলো প্রকাশ্যে এনেছিলেন, এবারও সেই একই ধারায় আকাঙ্ক্ষা চামোলারা নিজেদের অতীত সম্পর্কের কথা বলে ‘হেডলাইন’ তৈরি করছেন। শোটির প্রচার নিয়ে কঙ্গনা রনৌত এক বিবৃতিতে বলেছেন, “এই শো সব সময় নিজের সত্যকে স্বীকার করার গল্প, সেই সত্য যত অস্বস্তিকরই হোক না কেন।”
সব মিলিয়ে, ‘লক আপ’ কেবল একটি সাধারণ গেম শো নয়, বরং এটি মানুষের অবচেতন মনের গোপন ইচ্ছার এক বিতর্কিত প্রতিফলন। একদিকে এটি যেমন সম্পর্কের জটিলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো সামনে আনছে, অন্যদিকে নৈতিক সীমানা লঙ্ঘনের দায়েও বিদ্ধ হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ‘নেটফ্লিক্স’ গ্রাহকদের মাঝে এর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, বিতর্কিত কনটেন্টের প্রতি দর্শকদের এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করে। প্রতি শনিবার থেকে বুধবার রাত ৮টায় নেটফ্লিক্সে প্রচারিত হচ্ছে এই রোমাঞ্চকর রিয়েলিটি শোয়ের নতুন সব পর্ব।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।