মাকালু জয় করে ইতিহাস গড়লেন বাবর আলী: প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অনন্য এক মাইলফলক

হিমালয়ের গগনচুম্বী উচ্চতায় আবারও উড়ল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। পৃথিবীর পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ‘মাকালু’ জয় করে অনন্য এক ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি পর্বতারোহী বাবর আলী। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করে তিনি প্রথম কোনো বাংলাদেশি হিসেবে এই দুর্গম পর্বতটির চূড়ায় পা রাখার গৌরব অর্জন করলেন। আজ শনিবার (১ জুন) ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে বাবর আলী মাকালুর ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার উচ্চতার শিখরে আরোহণ করেন।

পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটারের চেয়ে উঁচু পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এই ১৪টি সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে বাবর আলী ইতোমধ্যেই ৫টি জয় করার অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমাল অঞ্চলে অবস্থিত মাকালু পর্বতটি এর খাড়া গঠন এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য পর্বতারোহীদের কাছে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হিসেবে পরিচিত।

বাবর আলীর এই ঐতিহাসিক অভিযানের শিরোনাম ছিল ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’। এই অভিযানের আয়োজক ছিল চট্টগ্রামের জনপ্রিয় পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান নেপালি সংবাদমাধ্যম ও মাকালু অ্যাডভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোহন লামসালের উদ্ধৃতি দিয়ে বাবরের এই সফলতার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পর্বতারোহণ মহলে ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ নামে পরিচিত এই মাকালু জয়ের লক্ষ্য নিয়ে গত ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন বাবর। নেপালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে ৯ এপ্রিল তিনি টুমলিংটার উড়ে যান। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১৮ এপ্রিল তিনি পৌঁছান মাকালুর বেসক্যাম্পে। উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য (অ্যাক্লাইমাটাইজেশন) তিনি কয়েক দফায় ক্যাম্প-১ এবং ক্যাম্প-২-এ যাতায়াত করেন।

চূড়ান্ত অভিযানের জন্য বাবর আবহাওয়া অনুকূলে আসার অপেক্ষা করছিলেন। গত ৩০ এপ্রিল পরিস্থিতির উন্নতি হলে তিনি আবারও যাত্রা শুরু করেন। ওই দিনই তিনি ৬৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ পৌঁছান। পরদিন ১ মে তিনি ৭৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ আরোহণ করেন। এরপর ওই রাতেই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন সেই চূড়ান্ত আরোহণ। টানা ১ হাজার ১০০ মিটারেরও বেশি খাড়া ও বরফে ঢাকা বিপজ্জনক পথ জয় করে আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি মাকালুর শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

বাবর আলীর এই অভিযানে তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে ছিলেন নেপালি অভিজ্ঞ শেরপা আং কামি। অভিযান ব্যবস্থাপক ফরহান জামান জানিয়েছেন, চূড়া থেকে নেমে বাবর আজই ক্যাম্প-২-এ ফিরবেন এবং আগামীকাল ৩ মে বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

বাবর আলীর পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। তিনি ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এর আগে ২০২২ সালে তিনি হিমালয়ের টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আমা দাবলাম জয় করেছিলেন। ২০২৪ সালে একই অভিযানে তিনি এভারেস্ট ও লোৎসে জয় করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। এ ছাড়া অন্নপূর্ণা-১ এবং কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই মানাসলু জয়ের রেকর্ডও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

বাবর আলীর এই দুঃসাহসিক মাকালু অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ভিজুয়াল নিটওয়ারস লিমিটেড, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন ও রহমান্স গ্রোসারিজ। প্রতিকূল পরিবেশ আর অদম্য মানসিক শক্তির সমন্বয়ে বাবরের এই বিজয় বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া