তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বর্তমান সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আরও ৪০ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করতে সরকারের আনুমানিক ১৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে একটি আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’। ইশতেহার অনুযায়ী, প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এখন এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান কোন খাত থেকে করা হবে, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিবিড় পর্যালোচনা চলছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিদ্যমান কোনো খাত থেকে এই অর্থ সমন্বয় করা হবে, নাকি বিশেষ কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে আজ বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, অর্থের উৎস সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই আসা প্রয়োজন।
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, "বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অন্য কোনো অনুৎপাদনশীল খাত থেকে বাজেট কাটছাঁট করে এখানে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য কেউ তালিকায় না ঢোকে, সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপকারভোগীদের একটি নির্ভুল কেন্দ্রীয় ‘ডেটাবেজ’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বর্তমানে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী এই সুবিধা পাচ্ছেন। চলতি জুন মাস পর্যন্ত এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের জন্য ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪০টির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। গত ২৫ মার্চ এক ত্রিপক্ষীয় সভায় টিআর ও কাবিখার মতো কর্মসূচিগুলোর টাকা ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে স্থানান্তর করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, টিআর, কাবিখা ও মানবিক সহায়তা খাতে প্রায় ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এসব খাতের দ্বৈততা পরিহার করে ফ্যামিলি কার্ডের সাথে একীভূত করলে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে বলেন, "রাজস্ব আদায়ের বর্তমান যে গতি, তাতে নতুন করে বিশাল বরাদ্দ দেওয়া কঠিন। তাই রাজস্ব ফাঁকি রোধ করে আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো ছেঁটে ফেলে ফ্যামিলি কার্ডে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।" সরকারের এই 'ফ্যামিলি কার্ড' উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয় এবং প্রান্তিক নারীর ক্ষমতায়নে কী ভূমিকা রাখে, তা এখন দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।