পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার পদায়ন চেয়ে চিঠি, বিতর্কের মুখে সেই উপদেষ্টাকেই সরালেন বিরোধীদলীয় নেতা

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টাকে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য এক নজিরবিহীন অনুরোধ জানিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে চিঠি দেন। বিরোধীদলীয় নেতার মতে, এই পদায়নের মাধ্যমে সরকারের কাছে বিরোধী দলের ‘পররাষ্ট্রনীতিসমূহ’ উপস্থাপন ও পর্যালোচনা সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি ‘ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা বিরোধীদলীয় নেতার এই অনুরোধ সম্বলিত চিঠি প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলীয় নেতার দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চিঠিটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।


তবে এই প্রস্তাব জানাজানি হওয়ার পর সাবেক ও বর্তমান পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং কূটনীতিকরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কোনো পদায়নের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশেও এমন নজির আছে বলে শোনা যায় না। তারা উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিরোধী দল ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বা ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ ও বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে থাকে, কিন্তু সরাসরি মন্ত্রণালয়ের কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হয় না।


বিশেষজ্ঞদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর কার্যক্রমে দেশের স্বার্থ, সরকারের অগ্রাধিকার এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক দর্শন—এই তিনটি বিষয়ের সূক্ষ্ম সমন্বয় রক্ষা করতে হয়। এমন একটি স্পর্শকাতর জায়গায় বিরোধী দলের কোনো প্রতিনিধিকে পদায়ন করা হলে তা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে মারাত্মক জটিলতা, বিশৃঙ্খলা এবং সমন্বয়হীনতার জন্ম দিতে পারে।


এদিকে, এই চিঠি নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধার পর পুরো ঘটনায় একটি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের একান্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম গতকাল রাতে জানান, চিঠির বিষয়ে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান জামায়াত আমিরকে অবহিত করেছিলেন এবং তিনি তাতে মৌখিক সম্মতিও দিয়েছিলেন। তবে ‘মন্ত্রীর পদমর্যাদা’ দেওয়ার অংশে তার কোনো সম্মতি ছিল না।


মো. নজরুল ইসলাম আরও স্পষ্ট করেন, বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানতে পারার পর আমির শফিকুর রহমান এ বিষয়ে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন। পরবর্তীতে, তাকে উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্থলে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকে বিরোধীদলীয় নেতার নতুন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে এবং এই পরিবর্তনের বিষয়টি পররাষ্ট্র সচিবকেও অবহিত করা হয়েছে।


চিঠিতে যা বলেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা:


গত ২২ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো সেই চিঠিতে বিরোধীদলীয় নেতা উল্লেখ করেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি তার দক্ষতা ও পেশাদার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরাম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সক্ষম হয়েছেন।


বিরোধীদলীয় নেতা নিজের এই প্রস্তাবকে ‘নতুন’ ও ‘অভিনব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে চিঠিতে লেখেন, "ভূরাজনৈতিক গতিশীলতা এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতি একসঙ্গে পরিচালনার জন্য এই পদায়নটি সরকারের কাছে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করছি।"


এই নজিরবিহীন প্রস্তাবের বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ূন কবীর বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনা করা নির্বাচিত সরকারের কাজ। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিরোধী দল কোনো ভূমিকা রাখতে চাইলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু সরকারি কাঠামোতে বিরোধী দলের কাউকে পদায়ন মন্ত্রণালয়ের কাজে বিশৃঙ্খলা কিংবা বাড়তি জটিলতা তৈরি করবে। এমন পদায়নের কোনো অভিজ্ঞতা বা নজির আছে বলে আমার জানা নেই।”


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।