ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে আরও পাঁচটি আসনে ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন পাঁচ প্রার্থী। তাঁদের করা পৃথক পাঁচটি নির্বাচনী আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। আজ সোমবার বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন, যা নির্বাচনী বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আবেদনকারী পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চারজনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর এবং অপর একজন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই পাঁচটি আসন হলো কুমিল্লা–১১, ময়মনসিংহ–২, চট্টগ্রাম–১৪, চাঁদপুর–৪ ও সিরাজগঞ্জ–৪। এই আসনগুলোতে ভোটের ফলাফল নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।
আবেদনকারী প্রার্থীরা হলেন: কুমিল্লা–১১ আসনে বিএনপির মো. কামরুল হুদা, ময়মনসিংহ–২ আসনে বিএনপির মোতাহার হোসেন তালুকদার, চট্টগ্রাম–১৪ আসনে এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুক, চাঁদপুর–৪ আসনে বিএনপির মো. হারুনুর রশিদ এবং সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে বিএনপির এম আকবর আলী। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে এই আইনি লড়াই এখন জনমনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনসংক্রান্ত আবেদনপত্র গ্রহণ ও শুনানির জন্য গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে একটি একক বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন। আজকের কার্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত এই পাঁচটি নির্বাচনী আবেদন মোশন (নতুন মামলা) হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আদালতে মো. হারুনুর রশিদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও আইনজীবী তানভীর হোসেন খান। মো. কামরুল হুদা ও মোতাহার হোসেন তালুকদারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস। এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুকের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির এবং বিএনপির এম আকবর আলীর পক্ষে আইনজীবী সেলিম রেজা শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। আইনজীবীদের এই উপস্থিতি মামলার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চাঁদপুর–৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল হান্নান ৭৩ হাজার ৫৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, যেখানে বিএনপির প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ পেয়েছিলেন ৬৭ হাজার ৮৩৩ ভোট। মো. হারুনুর রশিদের আইনজীবী তানভীর হোসেন খান জানান, হাইকোর্ট তাঁর মক্কেলের নির্বাচনী আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, "১১টি কেন্দ্রে ভোটে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছে। ব্যালট ও রেজাল্ট শিটসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম সংরক্ষণ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।" এই নির্দেশনার ফলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সব নির্বাচনী নথিপত্র এখন আদালতের পর্যবেক্ষণে থাকবে।
চট্টগ্রাম–১৪ আসনে বিএনপির জসীম উদ্দীন আহমেদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই আসনে এলডিপির ওমর ফারুক পেয়েছিলেন ৭৫ হাজার ৪৬ ভোট। ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে ওমর ফারুকের করা নির্বাচনী আবেদনটি আদালত গ্রহণ করেছেন। তাঁর আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে জানান, আদালত আগামী ৬ জুন পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন, যা এই মামলার গতিবিধি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ময়মনসিংহ–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৪ ভোট পেয়েছিলেন। আসনটিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, কুমিল্লা–১১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, যেখানে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা ৭৬ হাজার ৬৩৮ ভোট পেয়েছিলেন।
ময়মনসিংহ–২ ও কুমিল্লা–১১ আসনে বিএনপির দুই প্রার্থীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের বলেন, কুমিল্লা–১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদা বিজয়ী ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আবেদনটি করেন। আদালত আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরসহ প্রতিপক্ষের প্রতি নোটিশ জারি করেছেন। আদালত আগামী ৮ জুন নোটিশ ফেরতের জন্য তারিখ ধার্য করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সব নির্বাচনী সরঞ্জাম সংরক্ষণ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
একইভাবে, ময়মনসিংহ–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আবেদনটি করেছেন বলে জানান আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, আসনটিতে নির্বাচনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনী আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হয়েছে এবং ৮ জুন প্রতিপক্ষের প্রতি জারি করা নোটিশ ফেরতের জন্য তারিখ ধার্য করেছেন আদালত।
সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. রফিকুল ইসলাম খান ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, যেখানে বিএনপির প্রার্থী এম আকবর আলী ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৮ ভোট পেয়েছিলেন। এম আকবর আলীর আইনজীবী সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, মূলত পোস্টাল ব্যালটে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে এই নির্বাচনী আবেদনটি করা হয়। আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে আদালত ১০ জুন পরবর্তী শুনানির তারিখ রেখেছেন এবং ব্যালট, রেজাল্ট শিটসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম সংরক্ষণ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তিনি হাইকোর্টে নির্বাচনী আবেদন করতে পারেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত এরই মধ্যে ১৭ প্রার্থীর পৃথক ১৭টি নির্বাচনী আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে হবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।