তিন বছর নয়, স্বল্প সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ: এলডিসি উত্তরণে জাতিসংঘের নতুন শর্তে কী আছে?

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে সসম্মানে চূড়ান্ত উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর (২০২৯ সাল পর্যন্ত) বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিল বাংলাদেশ সরকার। তবে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এত দীর্ঘ সময়ের বদলে অপেক্ষাকৃত ‘স্বল্প সময়ের’ জন্য এই প্রস্তুতিমূলক মেয়াদ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। সিডিপি স্পষ্ট জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় এলডিসি ক্যাটাগরিতে রয়ে গেলে তা বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যকে ধীর করে দিতে পারে।


সম্প্রতি প্রকাশিত সিডিপির ‘বাংলাদেশ ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট মে ২০২৬’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সিডিপি জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি উত্তরণের তিনটি প্রধান শর্ত-মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক—বেশ বড় ব্যবধানেই পূরণ করে চলেছে। এমন সন্তোষজনক অবস্থায় তিন বছরের দীর্ঘ বর্ধিত সময় দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির গতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিডিপি মনে করে, একটি ছোট বা সীমিত মেয়াদের ‘ডেডলাইন’ বাংলাদেশকে এলডিসি-নির্ভরশীলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠে একটি উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতির দিকে ধাবিত হতে অনেক বেশি উৎসাহিত করবে।


তবে সময় বাড়ানোর এই সুপারিশকে কোনোভাবেই কাঠামোগত সংস্কারকাজে দেরি করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে কমিটি। বিশেষ করে, দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান ভঙ্গুর দশা এবং রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা দূর করার ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সময়কে একটি ‘অনুঘটক’ বা প্রভাবক হিসেবে ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের বড় ধরনের ও দৃশ্যমান সংস্কার ছাড়া শুধু সময় বাড়িয়ে কোনোভাবেই টেকসই উত্তরণ সম্ভব নয়।


সিডিপির এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি ‘দ্বিমুখী’ বা প্যারাডক্সিক্যাল অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। চ্যালেঞ্জের দিকটি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, দেশের ব্যাংক খাতে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা এবং ইইউর (EU) বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে নতুন করে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। তবে এত সব সংকটের মধ্যেও ২০২৬ সালের শুরুতে রেমিট্যান্সে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং এপ্রিলে রপ্তানি আয়ে এক লাফে ৩৩ শতাংশের বিশাল ইতিবাচক উল্লম্ফন দেশের নীতিনির্ধারকদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তুলছে।


সাধারণত যেকোনো দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো বৈধ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত বিশেষ বিবেচনায় নিয়েছে সিডিপি। কমিটি মনে করে, এই যুগান্তকারী সরকার পরিবর্তনের ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কৌশলে যে নতুন বিন্যাস বা রিঅ্যারেঞ্জমেন্ট প্রয়োজন, তার জন্য সত্যিই কিছুটা অতিরিক্ত সময়ের যৌক্তিকতা রয়েছে।


তবে সিডিপি তাদের প্রতিবেদনে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের এই বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সময় বাড়ানোর সুপারিশ করলেও ভবিষ্যতে পুনরায় সময় বৃদ্ধির আর কোনো আবেদনই গ্রহণ করা হবে না। ২০২৬ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত উত্তরণের সময়কাল ঠিক কতটা বাড়ছে, তা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।


এ বিষয়ে সিডিপির সদস্য ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ। একে কাজে লাগাতে সরকারকে যথাযথ সংস্কার প্রতিশ্রুতি ও পরিবীক্ষণযোগ্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জানানো বাঞ্ছনীয়।’


এদিকে, এই উত্তরণ প্রক্রিয়া মসৃণ করতে গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা দ্রুত জমা দিতে বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে বাংলাদেশ।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।