যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং দাম বাড়ছে। এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষারত চালকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা গেছে। অধিকাংশ পাম্পেই 'তেল নেই' ঘোষণা দিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারের চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন, অথচ পাম্পগুলো থেকে জানানো হচ্ছে যে তেলের সরবরাহ নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশে এক ধরনের 'আতঙ্কের কেনাকাটা' (panic buying) শুরু হয়েছে, যেখানে মানুষ দীর্ঘ লাইন ধরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনছেন। এর ফলে হঠাৎ করেই তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকারি মজুত দ্রুত কমে আসছে।
রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে সকাল সাড়ে ১০টায় গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কিছু সরকারি গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে না। পাম্পের বাইরে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষারত বেশ কয়েকজন চালককে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। মো. শাহনুর নামের একজন চালক অভিযোগ করে বলেন, "আমাদের বলা হয়েছে, দুপুর দুইটার আগে তেল দেওয়া যাবে না। অথচ এখন ঠিকই সরকারি লোকদের তেল দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সাধারণ জনগণকে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা কি এই দেশে ভাড়াটিয়া? কেন আমাদের তেল দেবে না?"
রাজারবাগ পাম্পের কোষাধ্যক্ষ (ক্যাশিয়ার) রিয়াজ উদ্দিন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, "ডিপো থেকে এখনো তেল আসেনি। আগে আমাদের কিছু তেল ছিল, আমরা সেগুলো পুলিশ, প্রশাসন ও জরুরি যানবাহনে অল্প অল্প করে দিচ্ছি। ডিপো থেকে তেল না আসা পর্যন্ত সবাইকে তেল দিতে পারব না।"
বেলা ১১টার দিকে দৈনিক বাংলা মোড়ে অবস্থিত বিনিময় ফিলিং স্টেশনে একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে কয়েকটি গাড়িতে পেট্রল দেওয়া হলেও কোনো বাইকে তেল দেওয়া হচ্ছিল না। এই পাম্পের ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমান জানান, তাদের গাড়ি ডিপো থেকে তেল আনতে গেছে। তেল এলেই তারা সবার কাছে বিক্রি করতে পারবেন।
মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে বেলা একটার সময় কোনো তেল বিক্রি হচ্ছিল না। পাম্পের সামনে একটি বোর্ডে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল—‘অকটেন, ডিজেল নেই।’ এই পাম্পের মালিক আবদুস সালাম বলেন, "গত বৃহস্পতিবার ডিপো থেকে আসা রিজার্ভের সব তেল বিক্রি করে শেষ করে ফেলেছি। এখন পাম্পে কোনো তেল নেই। আর এখন পর্যন্ত ডিপো থেকে পাম্পে তেল আসেনি। গাড়ি পাঠিয়েছি, কিন্তু সেখানেও লম্বা সিরিয়াল।" তিনি আরও জানান, ডিপো থেকে তেল আসার পরেই কেবল তারা বিক্রি শুরু করতে পারবেন।
আবদুস সালাম আরও বলেন, আগে ডিপো থেকে প্রতিদিন তাদের পাম্পে ৩০ হাজার লিটার তেল আসত। কিন্তু "আজকে মাত্র আড়াই হাজার লিটার তেল আসবে। এই তেল আসার পর কাকে কী দেব, জানি না।" তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "গতকাল (শনিবার) তেল শেষ হয়ে যাওয়ার পর চালকদের সঙ্গে আমার কর্মচারীদের হাতাহাতি হয়েছে। আজ পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় কে জানে।"
এই পাম্পের সামনে বেলা ১১টা থেকে তেলের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন পাঠাও চালক দেলোয়ার হোসেন। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, "সরকার বলেছে, ৪০ দিনের রিজার্ভ তেল রয়েছে। ৪০ দিনের রিজার্ভের তেল কি দুই দিনেই শেষ? আমরা কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছি না? তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, এই যুদ্ধটা যদি আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী হয়, বাংলাদেশে একবারে টোটালি তেল পাওয়া যাবে না।" চালকদের এমন মন্তব্যে সরকারের জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাপনার ওপর জনগণের আস্থাহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।