দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বইছে স্বস্তির হাওয়া। যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকরা সেচ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা-এই চার জেলার বিস্তীর্ণ জনপদে খালের পানি ব্যবহার করে বোরো ধান, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজি চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এর ফলে একদিকে যেমন শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভরতা কমেছে, অন্যদিকে প্রতি বিঘায় কৃষকদের সাশ্রয় হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা।
ঐতিহাসিক এই সেচ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। বর্তমানে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পাম্প হাউজ থেকে শক্তিশালী দুটি পাম্পের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। সেই পানি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে চার জেলার ১৩টি উপজেলার মাঠ পর্যায়ে। চলতি বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পানি ছাড়া শুরু হলে প্রকল্পের খালগুলো এখন পানিতে টইটম্বুর। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বর্তমানে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় দেখা গেছে, জিকে খালের পানিতে সজীব হয়ে উঠেছে ফসলি জমি। চুয়াডাঙ্গায় এবার ৭ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি এই সেচ সুবিধার আওতায় এসেছে, যার মধ্যে ধানি জমি ও ভুট্টার ক্ষেত প্রধান। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষক আনিসুর রহমান নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, "আগে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠত। একদিন পর পরই সেচ না দিলে জমি ফেটে যেত। কিন্তু এবার ক্যানালে পর্যাপ্ত পানি থাকায় আমাদের দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে। এই পানি পরিষ্কার ও আয়রনমুক্ত হওয়ায় ফসলের রঙও খুব সুন্দর হচ্ছে।"
কুষ্টিয়া জেলায় প্রকল্পের সুফল সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, যেখানে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে এই পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলামের মতে, শ্যালো মেশিন চালাতে ডিজেলের উচ্চমূল্য ছাড়াও মালিককে ফসলের একটি বড় অংশ দিতে হতো, যা এখন পুরোপুরি সাশ্রয় হচ্ছে। ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলাতেও একই ধরনের উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। মাগুরায় এবার ৬ হাজার ৩৩ হেক্টর জমি এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে।
চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ প্রকল্পের বিশদ তুলে ধরে জানান, চুয়াডাঙ্গাতেই ৪১ কিলোমিটার মূল খাল এবং ৩শ কিলোমিটারেরও বেশি শাখা ও উপ-খাল রয়েছে, যার মাধ্যমে পানি সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান সরকারের মতে, সময়মতো পানি সরবরাহ নিশ্চিত করায় এবার ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, এই প্রকল্পের সুফল পার্শ্ববর্তী মেহেরপুর জেলাতেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে কৃষকদের পক্ষ থেকে পাম্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের পলি জমে থাকা খালগুলো দ্রুত দখলমুক্ত ও সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। শত শত কিলোমিটারের এই বিস্তৃত সেচ ব্যবস্থা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।