রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘে তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাব

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকার সুরক্ষিত রেখে তাদের মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টার দিকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রথম প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির কথা বলেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে তারা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা অর্জন করতে পারেন।

তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষা যেন দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার ভূমিকা তুলে ধরে গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান।

পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এসব অপরাধ দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বক্তব্যে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকেও কয়েক দফায় তাদের আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটে।

তারেক রহমান বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ দেশটি থেকে পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

তবে শিবিরের পরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য আদর্শ নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপও বাড়ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর প্রভাব কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসনসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার দিকে পাড়ি দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমে আসছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য শুধু বাংলাদেশই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করবে এমনটিও প্রত্যাশিত নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা প্রকাশ নয়, সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। আমরা চাই, তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকবে।

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, গাম্বিয়ার উপরাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ বি. এস. জ্যালো, মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।