চার দশকের দাপুটে আধিপত্যে প্রথম আঘাত: টাঙ্গাইলের আলোচিত খান পরিবারের ছোট ছেলের ফাঁসি!

প্রায় চার দশক ধরে হত্যা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রবাজির অগণিত গুরুতর অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল টাঙ্গাইলের বহুল বিতর্কিত ‘খান পরিবার’। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক চাঞ্চল্যকর ফৌজদারি মামলা হলেও দৃশ্যমান কোনো বিচার বা সাজার মুখোমুখি হতে হয়নি কাউকেই। তবে চার দশকের সেই রাজনৈতিক প্রভাব ও বিচারহীনতার বৃত্ত অবশেষে ভেঙে গেছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হত্যা মামলায় ওই পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে সানিয়াত খান ওরফে বাপ্পার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এই প্রথমবারের মতো আলোচিত খান পরিবারের কোনো সন্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের কাঠগড়ায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা পেলেন।

গতকাল সোমবার টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ফয়সাল আল মামুন চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সানিয়াতসহ মোট তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং অপর চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নিহত রফিকুল ইসলাম ফারুক কেবল স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানই ছিলেন না, তিনি সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সকালে প্রাতর্ভ্রমণে বের হয়েছিলেন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক। সকাল আনুমানিক ছয়টার দিকে শহরের ব্যস্ততম বটতলা বাজার এলাকায় পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওঁৎ পেতে থাকা অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা তাঁকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহতের ভাই লাভলু মিয়া বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে দীর্ঘ তদন্তের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া তিন ভাড়াটে কিলার—শাজাহান, সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাঁরা স্বীকার করেন যে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান সানিয়াত খান বাপ্পা নগদ ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে তাঁদের ভাড়া করে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করেছিলেন। তবে এই তদন্তে নাম উঠে আসার আগেই ২০১৪ সালে কৌশলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সানিয়াত।

টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে এই খান পরিবারের উত্থান ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। সে সময় জেলা আওয়ামী লীগ মূলত দুটি স্পষ্ট ধারায় বিভক্ত ছিল; যার এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান খান এবং অপর পক্ষে ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। ১৯৯০ সালে কাদের সিদ্দিকী ভারত থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর এই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ রক্তক্ষয়ী আকার ধারণ করে। তৎকালীন সময়ে চাচা শামসুর রহমানের রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে তাঁর ভাতিজা আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি), আমানুর রহমান খান (রানা) ও সহিদুর রহমান খান (মুক্তি) শহরে নিজেদের একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন এবং শহরের একটি অংশের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সময় তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয় এবং একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে এক অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলায় আমিনুর রহমান খান বাপ্পি নিহত হলে বাহিনীর হাল ধরেন তাঁদের অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও সানিয়াত খান (বাপ্পা)। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই পরিবারের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি একচ্ছত্র রূপ নেয়। ২০১১ সালে সহিদুর টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন এবং ২০১২ সালের উপনির্বাচনে আমানুর টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে জাহিদুর স্থানীয় শীর্ষ ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন এবং পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান সানিয়াত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি পদ পান। ফলে পুরো টাঙ্গাইল জেলার রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি তাঁদের পরিবারের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে চার ভাইয়ের বিরুদ্ধেই হত্যা, চাঁদাবাজি ও দখলদারির সুনির্দিষ্ট বহু মামলা ছিল। আমানুরের বিরুদ্ধে অন্তত ৫টি হত্যাসহ অর্ধশতাধিক মামলা, সহিদুরের বিরুদ্ধে ৫টি হত্যাসহ প্রায় ৪০টি মামলা, জাহিদুরের বিরুদ্ধে ৩টি হত্যা মামলা এবং সানিয়াতের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যাসহ ডজনখানেক মামলা দায়ের হয়। তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রভাব খাটিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহার কিংবা বাদীপক্ষকে অস্ত্র ও প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করার কারণে এতদিন কোনো মামলাতেই তাঁদের সাজা হয়নি। এমনকি গত বছর আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাবাসের পর এই চার ভাই আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যান।

অবশেষে চেয়ারম্যান রফিকুল হত্যা মামলার রায়ের মাধ্যমে খান পরিবারের অপরাধ সাম্রাজ্যে প্রথম আইনি আঘাত এলো। বিদেশে পলাতক থাকা অবস্থায় সানিয়াত খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও তাঁর অপর ভাই জাহিদুরও বর্তমানে পলাতক থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। এছাড়া আলোচিত ফারুক হত্যা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর অপর দুই ভাই সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ও সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তিও বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।