মাত্র দুই বছর আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি জিম্বাবুয়ে। বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে তখন প্রায় ‘অদৃশ্য’ এক দল হিসেবে পরিচিত ছিল তারা। কিন্তু সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরেছে; ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই জিম্বাবুয়েই এখন ক্রিকেট দুনিয়ার সবচাইতে আলোচিত নাম। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো বাঘা বাঘা দলকে বিদায় করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সুপার এইটে পা রাখা দলটি বর্তমান টুর্নামেন্টের সবচাইতে বড় চমক। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতেও সিকান্দার রাজাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ১০৭ রানের বিশাল হার তাদের আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাসকে এক নিমিষেই মাটির কাছাকাছি নামিয়ে এনেছে।
এমন এক টালমাটাল পরিস্থিতিতে আজ চেন্নাইয়ের এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হচ্ছে স্বাগতিক ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত। ক্রিকেট মহলে এখন বড় প্রশ্ন—জিম্বাবুয়ের এই মরণপণ লড়াই কি তবে গ্রুপ পর্বেই শেষ, না কি ভারতের বিপক্ষে নতুন কোনো রূপকথা লিখতে পারবে তারা? গ্রুপ ‘বি’তে যখন জিম্বাবুয়ের নাম ঘোষণা হয়েছিল, অনেকেই ভেবেছিলেন তারা স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। কিন্তু ব্লেসিং মুজারাবানিদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আর ব্রায়ান বেনেটদের অদম্য মানসিকতা প্রমাণ করেছে তারা ফুরিয়ে যায়নি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়াকে ২৩ রানে হারিয়ে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটিয়েছিল এই আফ্রিকার দেশটি। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ক্যারিবিয়ান ঝড়ে তাদের বোলিং লাইনআপ লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়াটা ছিল বড় এক ধাক্কা। জিম্বাবুয়ের কোচ জাস্টিন স্যামনস অবশ্য একে দেখছেন একটি ‘রিয়েলিটি চেক’ হিসেবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ভারত ঠিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতোই আমাদের ওপর তেড়েফুঁড়ে আসবে। আমাদের শান্ত থাকতে হবে এবং চাপের মুখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।”
অন্যদিকে, ভারতের ওপর পাহাড়সম চাপ কাজ করছে। কাগজে-কলমে এই ম্যাচটি ভারতের জন্য অনেক বেশি সহজ হওয়ার কথা থাকলেও, সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুপার এইটের শুরুতেই দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানে হেরে ভারতের নেট রান রেট এখন আশঙ্কাজনকভাবে -৩.৮-এ নেমে গেছে। যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নেট রান রেট +৫.৩৫। সেমিফাইনালের দৌড়ে টিকে থাকতে হলে ভারতকে আজ কেবল জিতলেই চলবে না, বরং একটি বিশাল জয় তুলে নিয়ে নেট রান রেটের জটিল মারপ্যাঁচ এড়াতে হবে। চেন্নাইয়ের এই লড়াই ভারতের জন্য কার্যত একটি ‘রাউন্ড অব সিক্সটিন’-এর সমতুল্য। আজ যদি অন্য ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দেয়, তবে ভারতের পথ কিছুটা প্রশস্ত হবে, নতুবা বিদায়ের ঘণ্টা বাজার উপক্রম হতে পারে।
জিম্বাবুয়ের সবচাইতে বড় শক্তি হলো তাদের ‘হারানোর কিছু নেই’—এই ভয়হীন মানসিকতা। অধিনায়ক সিকান্দার রাজা তাঁর দলকে বারবার একটি ‘সিম্পল স্ট্র্যাটেজি’ বা সহজ দর্শনের কথা বলছেন, যা হলো নিজেদের স্বাভাবিক খেলায় আস্থা রাখা। চেন্নাইয়ের স্পিন-সহায়ক উইকেটে ওয়েলিংটন মাসাকাদজা আর রায়ান বার্ল ভারতের বিশ্বখ্যাত ব্যাটিং লাইনআপকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। পাশাপাশি রিচার্ড এনগারাভার বাঁ-হাতি ‘অ্যাঙ্গেল’ এবং পেস আক্রমণ ভারতীয় টপ অর্ডারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ব্যাটিংয়ে যদি ডিওন মায়ার্স আর বেন কারেনরা রুখে দাঁড়ান, তবে এই ম্যাচ জয় ভারতের জন্য মোটেও নস্যি হবে না।
ভারতের জন্য আজকের এই লড়াইটি কেবল ব্যাটে-বলে দক্ষতার প্রমাণ দেওয়া নয়, বরং এটি একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। বিশ্বকাপ জয়ের পথে কেবল বড় দলকে হারানোই শেষ কথা নয়, ছোট দলের কাছে হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি এড়ানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতকে আজ জয়ের জন্য বড় ঝুঁকি নিতে হবে রান রেট বাড়াতে, আর যেখানেই উচ্চ ‘রিস্ক’ বা ঝুঁকি থাকে, সেখানেই লুকিয়ে থাকে অঘটনের সম্ভাবনা। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ে এখনো ভয়হীন, আর ক্রিকেট বিশ্ব জানে—ভয়হীন প্রতিপক্ষই যে কারো জন্য সবচাইতে ভয়ংকর।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।