চিন্তাশক্তি কি ঘন কুয়াশায় ঢাকা? আপনার মস্তিষ্ক ‘ব্রেন ফগ’-এর শিকার হচ্ছে না তো?

আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমরা সবাই এখন যন্ত্রের মতো ছুটছি। হাতের ‘স্মার্টফোন’-এর অবিরাম ‘নোটিফিকেশন’, অফিসের কাজের পাহাড়সম চাপ আর প্রাত্যহিক জীবনের অস্থিরতায় আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না বললেই চলে। তবে কখনো কি এমন মনে হয়েছে যে, খুব সাধারণ কোনো কাজ করতে গিয়েও আপনি খেই হারিয়ে ফেলছেন? কিংবা কোনো বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছেন কিন্তু মাথায় কিছুই ঢুকছে না? চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই বিশেষ অবস্থাকেই বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’। এটি নিজে কোনো স্বতন্ত্র রোগ না হলেও, আপনার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ স্থিতি নষ্ট হওয়ার এক বড় ধরণের বিপদ সংকেত।

‘ব্রেন ফগ’ বা মস্তিষ্কের এই আচ্ছন্ন ভাব মূলত স্নায়বিক কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি বহিঃপ্রকাশ। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি মনোযোগের তীব্র সংকটে ভোগেন। দিনের পর দিন একই কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান অনেকেই। এমনকি খুব কাছের মানুষের নাম মনে করতে পারা কিংবা ঘরের চাবি বা প্রয়োজনীয় ফাইলটি কোথায় রেখেছেন—তা বেমালুম ভুলে যাওয়াও এই সমস্যার অন্যতম লক্ষণ। শরীরে পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়ার পরেও যখন মস্তিষ্ক একধরণের স্থবিরতা বা ক্লান্তিবোধ করে, তখনই বুঝতে হবে আপনার চিন্তাশক্তি ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক ও শারীরিক কারণ দায়ী। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ ও ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের ‘ডিজিটাল ওভারলোড’ বা সারাক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকার অভ্যাস মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতাকে ধীর করে দিচ্ছে। ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্ক তার ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত প্রোটিন বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারে না, যা পরবর্তীতে ‘ভাইরাস’-এর মতো মস্তিষ্কের সজীবতাকে গ্রাস করে। এর পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা, বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২, আয়রন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।

তবে আশার কথা হলো, সঠিক জীবনধারা এবং সামান্য কিছু সচেতনতার মাধ্যমেই এই কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। চিকিৎসকরা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন; অর্থাৎ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় স্মার্টফোন ও কম্পিউটার থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শরীরচর্চা করলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ‘মাল্টিটাস্কিং’ বা একই সাথে একাধিক কাজ করার প্রবণতা কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস করা উচিত।

পরিশেষে মনে রাখতে হবে, ব্রেন ফগ কেবল সাময়িক কোনো বিরক্তি নয়, বরং এটি আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের এক গভীর বার্তা। জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পরেও যদি স্মৃতিভ্রম বা মনোযোগের অভাব কমতে না থাকে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নিলে এটি দীর্ঘমেয়াদী অবসাদ কিংবা স্নায়বিক জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।