দেশজুড়ে বয়ে চলা তীব্র দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তীব্র গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে তরল ও লবণ বেরিয়ে যায়। সাধারণ এক ধারণা প্রচলিত আছে যে, কেবল প্রচুর পরিমাণে পানি পান করলেই ‘ডিহাইড্রেশন’ বা পানিশূন্যতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ (NHS) এবং আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, শরীরকে আর্দ্র রাখতে কেবল সাধারণ পানি পান করাই সবসময় যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানী ড. শার্লট মিলসের মতে, একজন মানুষের পানির চাহিদা মূলত তাঁর বয়স, শারীরিক গঠন এবং দৈনন্দিন কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। তবে অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. আইসলিং ডেলি বিষয়টিকে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, পানির পাশাপাশি আমাদের এমন সব খাবার গ্রহণ করা উচিত যেগুলোতে প্রাকৃতিক উপায়েই পানির পরিমাণ বেশি থাকে। খাদ্যতালিকায় শসা, টমেটো, লেটুস, তরমুজ ও স্ট্রবেরির মতো ফল ও সবজি রাখা জরুরি, যেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই পানি। এমনকি সেদ্ধ ডিমেও প্রায় ৭৫ শতাংশ পানি থাকে যা শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক। পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শরীরে পানির অভাব আছে কি না তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রস্রাবের রং লক্ষ করা। প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ বা কমলা হওয়া মানেই আপনি মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভুগছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একটি প্রচলিত বিতর্ক হলো—প্রচণ্ড গরমে চা বা কফির মতো গরম পানীয় পান করা ঠিক কি না। ড. আইসলিং ডেলির মতে, গরম পানীয় পান করলে শরীর দ্রুত ঘামতে শুরু করে এবং সেই ঘাম বাষ্পীভূত হওয়ার সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপ বের করে দেয়। অন্যদিকে বরফ শীতল পানি পান করলে শরীর নিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বজায় রাখতে বাড়তি শক্তি ব্যয় করে, ফলে ঘাম হতে কিছুটা দেরি হয়। তবে অতিরিক্ত ‘কফেইন’ সমৃদ্ধ পানীয় প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা উল্টো পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দিনে এক-দুই কাপ চা বা কফি নিরাপদ হলেও এর চেয়ে বেশি না খাওয়াই শ্রেয়।
খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের ভূমিকা নিয়েও সচেতন করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই মনে করেন গরমে দুর্বলতা কাটাতে বেশি করে প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া দরকার। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, প্রোটিন হজম করতে শরীরের ‘মেটাবলিজম’ প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়, যার ফলে শরীরের ভেতর আরও বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। তাই এই সময়ে অতিরিক্ত গরু বা খাসির মাংস খাওয়ার বদলে ডাল, ডিম, টক দই, বাদাম কিংবা গ্রিল করা মুরগির মাংসের মতো সহজপাচ্য প্রোটিন বেছে নেওয়া উচিত। মাছের ক্ষেত্রে রুই, কাতলা বা দেশি ছোট মাছের ঝোল এই আবহাওয়ায় শরীরকে সুস্থ রাখতে বেশি কার্যকর। তীব্র গরমে সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হলো—সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সহজপাচ্য খাবারের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।