ইউরোপিয়ান ফুটবলে গ্রিজমান যুগের বিষাদময় সমাপ্তি: শূন্য দৃষ্টিতে বিদায় নিলেন আতলেতিকোর প্রাণভোমরা

চ্যাম্পিয়নস লিগের রোমাঞ্চকর সেমিফাইনাল লড়াইয়ের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে কেবল একটি ম্যাচেরই ইতি ঘটেনি, বরং অবসান হলো ইউরোপীয় ফুটবলের এক বর্ণিল ও লড়াকু অধ্যায়ের। লন্ডনের ক্লাব আর্সেনালের কাছে হেরে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আঙিনা থেকে চিরবিদায় নিলেন ফরাসি বিশ্বকাপজয়ী তারকা আঁতোয়ান গ্রিজমান। মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিতে উপস্থিত অগণিত সমর্থকদের উদ্দেশে হাততালি দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও, গ্রিজমানের দুই চোখের গভীর শূন্যতা আর বিষণ্নতা ভক্তদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি করেছে।

আঁতোয়ান গ্রিজমান আধুনিক ফুটবলের সেই বিরল প্রতিভা, যিনি চাইলে রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা বায়ার্ন মিউনিখের মতো বিশ্বজয়ী যেকোনো ক্লাবে থিতু হতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রামের পথ, বেছে নিয়েছিলেন আতলেতিকো মাদ্রিদকে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছালেও, প্রিয় ক্লাব আতলেতিকোর হয়ে লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারার দগদগে ক্ষত নিয়েই তাঁকে ইউরোপীয় মঞ্চ ছাড়তে হচ্ছে। চলতি মৌসুম শেষেই ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড পাড়ি জমাবেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব অরল্যান্ডো সিটিতে। লা লিগায় আর মাত্র চারটি ম্যাচ বাকি থাকলেও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে এটাই ছিল তাঁর শেষ পদচিহ্ন।

পরিসংখ্যানের পাতায় গ্রিজমান আতলেতিকোর এক অবিসংবাদিত নায়ক। ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (২১২ গোল) হওয়ার গৌরব তাঁর দখলে। গোল করানোর ক্ষেত্রেও ৯৪টি ‘অ্যাসিস্ট’ নিয়ে তিনি রয়েছেন তালিকার তৃতীয় স্থানে। দুই দফায় মাদ্রিদের এই ক্লাবে দীর্ঘ ১০ মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে একটি ইউরোপা লিগ, একটি উয়েফা সুপার কাপ এবং একটি স্প্যানিশ সুপার কাপ থাকলেও ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আরাধ্য ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ’ শিরোপাটি চিরকালই তাঁর কাছে অধরা রয়ে গেল। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার সেই দুঃসহ স্মৃতি হয়তো তাঁর বিদায়বেলাকেও ভারি করে তুলেছে।

বিদায়বেলায় প্রিয় ছাত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভুল করেননি কোচ দিয়েগো সিমিওনে। তিনি গ্রিজমানকে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক ‘আদর্শ রোল মডেল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “তোমার কঠোর পরিশ্রম এবং বিনয়ের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তুমি আমাদের যা দিয়েছ, তার জন্য ফুটবল বিশ্ব তোমাকে মনে রাখবে।” গ্রিজমান নিজেও স্বীকার করেছেন, রিয়াল সোসিয়েদাদ ছাড়ার পর আতলেতিকোর ব্যাজ আর জার্সির প্রতি তাঁর যে টান তৈরি হয়েছিল, তা ভালোবাসার চেয়েও গভীর কিছু।

মাঠে গ্রিজমানের উপস্থিতি মানেই ছিল নিরলস পরিশ্রম আর সৃজনশীল ফুটবলের এক অনন্য মিশেল। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, বরং মাঠের অন্দরে একজন অসাধারণ ‘গল্পকথক’ ছিলেন, যাঁর প্রতিটি ড্রিবলিং আর শটে লুকিয়ে থাকত নতুন কোনো মহাকাব্য। কিন্তু গতকাল রাতের সেই চিত্রটি ভিন্ন ছিল। আর্সেনালের বিপক্ষে হারের পর তাঁর সেই রিক্ত চাহনি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—ফুটবল কখনো পরম পাওয়ার নাম, আবার কখনো সীমাহীন আক্ষেপের। নতুন প্রজন্মের সমর্থকেরা হয়তো ভবিষ্যতে গ্রিজমানের সেই মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটি দেখিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, ‘ওই দেখো, এক কিংবদন্তির চোখে আকাশসম শূন্যতা আর হাহাকার।’

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।