বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানকে ‘পিছু হটা’র ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করছে, জনগুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুতে কার্যকর সংস্কারের পথে না হেঁটে সরকার বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পুরোনো পথেই অগ্রসর হচ্ছে।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগের কথা জানান সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ‘রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে টিআইবির অবস্থান’ তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের মতো মৌলিক বিষয়ে এক ধরনের পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আমরা আশা করি, বিএনপি নিজেদের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের কথা স্মরণে রাখবে। তাদের উচিত হবে নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে দৃঢ়ভাবে কাজ করা।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা বিএনপির বিশেষ কমিটি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছে। এই সিদ্ধান্তকে টিআইবি সাধুবাদ জানালেও অন্য কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে পরিণত না করে ‘যাচাই-বাছাই’-এর নামে ঝুলিয়ে রাখাকে একটি অনিশ্চিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং পৃথক সচিবালয় গঠনবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ তিনটিসহ মোট চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, “নিয়োগ অধ্যাদেশটি রহিত করার অর্থ হলো বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আবারও রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারপ্রধানের মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া। এটি এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটার শামিল।”
টিআইবির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের মতো জনবান্ধব ও স্বাধীন কমিশন গঠনের সুযোগ থাকার পরও সেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এছাড়া স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী বলে মনে করে সংস্থাটি।
ইফতেখারুজ্জামান গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই অধ্যাদেশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে মানবাধিকার কমিশন কেবল একটি ‘ঠুঁটো জগন্নাথে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান কড়া ভাষায় বলেন, “অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমানে এক ধরনের ‘খেলা’ হচ্ছে। এখানে রাজনীতি ও আমলাতন্ত্র—উভয় দিক থেকেই প্রতিরোধ আসছে। দৃশ্যত আমলাতন্ত্রই এখনো মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংস্কারের বিষয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের কথার ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সঞ্চালনা করেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও নীতি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।