আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের অস্বাভাবিক অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আগামী মাস থেকে দেশে তেলের দাম পুনঃসমন্বয় বা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই তথ্য জানান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মন্ত্রিসভার আলোচনার মাধ্যমেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে মৌলভীবাজার–২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম জনগুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্নে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চান। এর জবাবে মন্ত্রী বলেন, "জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করা হয়। গত মাসে আমরা দাম বৃদ্ধি করিনি। বর্তমানে আগামী মাসের সম্ভাব্য মূল্য নিয়ে কাজ চলছে। যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে দাম বাড়ানো প্রয়োজন, তবে মন্ত্রিসভায় বিস্তারিত আলোচনার পরই তা কার্যকর করার চিন্তা করা হবে।"
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলা এবং ইরানের পক্ষ থেকে হরমজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই ‘গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন’ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ-পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে, যা পরোক্ষভাবে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে সরকার সম্ভাব্য সব উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ টেনে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, পাকিস্তান ইতিবাচকভাবে জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশ বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি রেশনিং এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভারত, আফগানিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপও ইতোমধ্যে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ সরকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদনের কথা মাথায় রেখে এপ্রিল মাসে দাম অপরিবর্তিত রেখেছে।
দেশে বর্তমান জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন ডিজেল মজুত আছে এবং ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন দেশে পৌঁছাবে। এছাড়া ১০ হাজার ৫০০ টন অকটেনের বিপরীতে আরও ৭১ হাজার ৫৪৩ টন এবং ১৬ হাজার টন পেট্রলের বিপরীতে আরও ৩৬ হাজার টন আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সেচ মৌসুমে কৃষকদের জ্বালানি সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি, অসাধু চক্র যাতে তেলের অবৈধ মজুত করতে না পারে, সেজন্য সারা দেশে মোবাইল কোর্ট ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ৩ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩৪২টি অভিযানে ২ হাজার ৪৫৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ডসহ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৩১ জনকে। এসময় প্রায় ৪০ লাখ ৪৮ হাজার লিটারের বেশি জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। খনিজ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের ‘কনডেনসেট’ থেকে পেট্রল ও ডিজেল উৎপাদন প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।