দৈনন্দিন চলাফেরায় হুট করেই গোড়ালি ব্যথা অনেকের জন্য এক অসহ্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম পা ফেলার সময় কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হাঁটতে গেলে যে তীব্র ব্যথার অনুভূতি হয়, তা জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দিতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে এখন আর এই যন্ত্রণার জন্য কেবল ব্যথানাশক ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ‘এক্সট্রাকোরপোরাল শকওয়েভ থেরাপি’ (ESWT) নামক এক আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
অনেকেই ‘শকওয়েভ থেরাপি’ নাম শুনে একে বৈদ্যুতিক শকের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। তবে বিষয়টি স্পষ্ট করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহ নয়, বরং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এক বিশেষ শব্দতরঙ্গ (Acoustic waves)। একটি অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে এই তরঙ্গ সরাসরি ব্যথার নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক গোড়ালি ব্যথার ক্ষেত্রে এই থেরাপির সাফল্যের হার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত, যা চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক নতুন চমক।
এই থেরাপি কীভাবে কাজ করে?
গোড়ালির নিচে থাকা শক্ত পর্দা বা ‘প্লান্টার ফাসা’ যখন অতিরিক্ত চাপ বা ক্ষুদ্র ফাটলের কারণে প্রদাহ সৃষ্টি করে, তখনই ব্যথার উৎপত্তি হয়। শকওয়েভ থেরাপি মূলত তিনটি বিশেষ উপায়ে নিরাময় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে:
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি: প্রযুক্তিনির্ভর এই শব্দতরঙ্গ ব্যথার স্থানে নতুন রক্তনালি তৈরিতে উদ্দীপনা জোগায়, যা আক্রান্ত অংশে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।
কোষের দ্রুত পুনর্গঠন: এটি শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে (Self-healing power) সক্রিয় করে তোলে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু বা পর্দা দ্রুত মেরামত হয়।
ক্যালসিয়ামের আস্তরণ দূর: অনেক সময় গোড়ালির হাড় বেড়ে গিয়ে ক্যালসিয়ামের শক্ত স্তর তৈরি হয়, যা শকওয়েভ সহজেই ভেঙে দিতে সক্ষম।
পদ্ধতি ও সতর্কতা:
এই চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এতে কোনো ধরনের ‘অ্যানেসথেসিয়া’ বা অবশকারী ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ থেকে ৫টি ‘সেশন’ নিতে হতে পারে। প্রতি সেশনে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় ব্যয় করেই সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সাধারণত সপ্তাহে একবার করে এই থেরাপি দেওয়া হয়।
তবে এই আধুনিক থেরাপি নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। রাজধানীর রি-অ্যাকটিভ ফিজিওথেরাপি সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট মো. সাইদুর রহমান জানান, পদ্ধতিটি অত্যন্ত নিরাপদ হলেও অন্তঃসত্ত্বা নারী, ক্যানসার আক্রান্ত রোগী, পেসমেকার ব্যবহারকারী এবং তীব্র রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিদের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়। তাই গোড়ালি ব্যথার সঠিক সমাধান পেতে একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।