ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলার কারণে সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও অস্থিতিশীল রূপ নিয়েছে। এমন এক চরম উত্তেজনাকর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রেক্ষাপটে সেখানে আটকে পড়া কয়েক শ বাংলাদেশিকে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। সব ঠিক থাকলে ঈদের আগেই, অর্থাৎ ১৯ মার্চ প্রায় ২০০ জন বাংলাদেশি আজারবাইজানের রাজধানী বাকু হয়ে নিরাপদে ঢাকায় পদার্পণ করবেন বলে জোর প্রস্তুতি চলছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দৈনিক প্রথম আলোকে এই উদ্ধার অভিযানের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আজারবাইজান থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে এই প্রবাসীদের ঢাকায় নিয়ে আসা হবে।
জানা গেছে, পুরো উদ্ধার প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে তদারকি করার জন্য তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হককে আজারবাইজানে পাঠানো হচ্ছে। আঙ্কারা থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি জানান, যে সকল বাংলাদেশি এই মুহূর্তে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক, তাঁদেরকে ইরান থেকে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে তাঁদেরকে সড়কপথে ইরাক সীমান্ত হয়ে আজারবাইজানে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর সেখান থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে তাঁদের স্বদেশে পাঠানো হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ইরান থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইরানে অবস্থানরত সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরানোর জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। সব মিলিয়ে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রায় ৩০০ জনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে দুই ধাপে প্রায় ৩০০ বাংলাদেশিকে ইরান থেকে ঢাকায় ফেরানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে, আগামী ১৯ মার্চ আজারবাইজান থেকে বাংলাদেশ বিমানের চার্টার্ড ফ্লাইটে করে প্রায় ২০০ জনকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম দফায় যাঁরা দেশে ফিরবেন, তাঁদের এই তালিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত কোনো কূটনীতিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা থাকছেন না।
ঢাকা ও তেহরানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চলতি মাসের প্রথম দিকেই আজারবাইজানে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইরান থেকে এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিকে নিরাপদে ফেরানোর পুরো বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য তুরস্কে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সরাসরি আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। পাশাপাশি, এই বাংলাদেশিদের আজারবাইজান থেকে ঢাকায় ফেরার অনুমতি ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন সেখানকার আজারবাইজান দূতাবাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দিল্লির আজারবাইজান দূতাবাসে দুই ধাপে যথাক্রমে ২০২ ও ৭২ জনের ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। স্বস্তির বিষয় হলো, আজারবাইজান কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বাংলাদেশের ওই ২৭৪ জনের অন অ্যারাইভাল ভিসা অনুমোদন করেছে।
জানা গেছে, ইরান থেকে দেশে ফিরতে যাওয়া এই নাগরিকদের মধ্যে অনেকেরই নিজস্ব পাসপোর্ট নেই। তবে যাঁদের পাসপোর্ট নেই, তাঁদের নির্বিঘ্নে দেশে ফেরার সুবিধার্থে তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এরই মধ্যে ‘ট্রাভেল পাস’ সরবরাহ করা হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে যে ২০০ জনকে দেশে ফেরানো হচ্ছে, তাঁদের বিষয়ে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে। সেই সঙ্গে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন সেখানকার আজারবাইজান দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত অন অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে তাঁরা কোনো রকম কালক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে পারেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।