নিজস্ব অ্যাপ তৈরি করে অস্ট্রেলিয়ার জাল ভিসা সরবরাহ! টিআই ট্রেডিংয়ের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের পতন

রাজধানীতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী ও প্রতারক চক্র, যারা সাধারণ মানুষের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ‘গোল্ডেন অপরচুনিটি’ বা সুবর্ণ সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎকারী একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৪)। গ্রেফতারকৃতরা হলেন-চক্রের মূলহোতা মো. তারেকুল ইসলাম (৪৫), মো. মাইনুদ্দিন ভূইয়া (৪৮), মো. নেওয়াজ (৪৫) এবং আবু হাসান (৪৮)।


মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের পাইকপাড়ায় অবস্থিত র‍্যাব-৪ এর ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম। তিনি জানান, ‘টিআই ট্রেডিং করপোরেশন’ নামক একটি তথাকথিত ভিসা প্রসেসিং প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে আসছিল।


তদন্তে বেরিয়ে এসেছে প্রতারণার এক অত্যন্ত আধুনিক ও অভিনব কৌশল। সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার ভিসা অনুমোদিত হলে তা সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশনের ‘অফিশিয়াল’ ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। এই বিষয়টিকেই জালিয়াতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চক্রটি। তারা নিজস্ব একটি ‘স্মার্টফোন অ্যাপ’ তৈরি করে, যেখানে ভুক্তভোগীদের ভুয়া তথ্য ইনপুট দিয়ে দেখানো হতো যে তাদের ভিসা প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই ডিজিটাল কারসাজিতে বিশ্বাস করে ব্যক্তিপ্রতি ২১ লাখ টাকা করে জমা দেন ভুক্তভোগীরা।


ভুক্তভোগী মো. শরীফ মোল্লা (২৮) জানান, তিনি নিজে এবং তাঁর ভাতিজা ওমর ফারুক, চাচাতো ভাই আবুল কালাম ও ভাগিনা সাজ্জাদ হোসেনকে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ১২ মে এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে মোট ৯৪ লাখ টাকা তুলে দেন চক্রের অন্যতম সদস্য মো. তারেকুল ইসলামের হাতে। এই বিপুল অর্থ তারা ‘এশিয়া ব্যাংক টিআর গ্রুপ’ নামক একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা করেন। টাকা ও পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর তাদের অতি দ্রুতই ফ্লাইটের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।


তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা এজেন্সির অফিসে ক্রমাগত তাগাদা দিতে থাকেন। একপর্যায়ে টিআই ট্রেডিং করপোরেশন কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে ‘ভিসা’ ও ‘এয়ার টিকিট’ ধরিয়ে দেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এই ভুক্তভোগীরা যখন নির্ধারিত তারিখে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিমানবন্দরে যান, তখন সেখানকার কর্মকর্তাদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে তাদের সব নথিপত্রই ভুয়া। পরবর্তীতে বাংলাদেশে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনে যোগাযোগ করে তারা নিশ্চিত হন যে তারা এক ভয়ংকর সুসংগঠিত জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাদের প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।


র‍্যাব অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম আরও জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত ধূর্ত। তারা এক স্থানে প্রতারণা শেষ করে অফিস গুটিয়ে অন্য স্থানে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন নামে একই প্রক্রিয়ায় প্রতারণা শুরু করত। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২ মার্চ রাজধানীর উত্তরা কাওলাবাজার ও যাত্রাবাড়ী শনির আখড়া এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই চারজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও বিভিন্ন থানায় এনআই অ্যাক্টের (চেক জালিয়াতি) একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল।


র‍্যাব জানায়, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের পাশাপাশি এই ধরনের মানবপাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে তারা সর্বদা বদ্ধপরিকর। এর আগে চীন ও রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখানো চক্রকেও র‍্যাব-৪ সফলভাবে গ্রেফতার করেছিল। বর্তমানে গ্রেফতারকৃত এই চার আসামিকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।