রাজধানীর কোলঘেঁষে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র কেরানীগঞ্জের তেলঘাট এখন ভেজাল তেলের নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে সাধারণ পোড়া মবিলকে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে ডিজেলে। আর এই পুরো কারসাজির নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী কালোবাজারি সিন্ডিকেট। এই অসাধু চক্রটি তেলঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের প্রতারিত করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের তেলঘাটে একদল ব্যবসায়ী মিলে গড়ে তুলেছেন একটি অঘোষিত শক্তিশালী জোট। এই ঘাটে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা ভেজাল তেল তৈরি করে এবং তা চড়া মূল্যে বাজারে ছাড়ে। অনুসন্ধানী দল ক্রেতার ছদ্মবেশে সেখানে গেলে এই জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে আসে। চক্রের একজন কর্মী জানান, সন্ধ্যার পর এখানে তেলের মেলা বসে। তবে শর্ত একটাই— লিটারপ্রতি অন্তত ২০ টাকা বেশি গুণতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ দিলে চাহিবামাত্রই মিলবে ‘স্পেশাল’ এই ডিজেল।
স্থানীয়দের কাছে এই ভেজাল কারবারের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি। তেলের সঙ্গে মবিল ও অন্যান্য রাসায়নিক মেশানোর দক্ষতায় তিনি এখন ‘মিকচার জাহাঙ্গীর’ নামেই সমধিক পরিচিত। জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠান ‘জিসান অয়েল সাপ্লাই’-এর সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে ডিজেলের সঙ্গে পোড়া মবিল মেশানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। সেখানে পোড়া মবিল জ্বাল দিয়ে লাল রঙের তৈলজাতীয় পদার্থ তৈরির একটি অস্থায়ী স্থাপনাও পাওয়া গেছে। তবে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত সটকে পড়েন সেখানকার শ্রমিকরা।
এই জালিয়াতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে জানান, প্রথমে পোড়া মবিল বড় ড্রামে ঢেলে উচ্চতাপে জ্বাল দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় ময়লা, মবিল ও তেল আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তীতে সংগৃহীত সেই তেল ভালো মানের ডিজেলের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। অবাক করা বিষয় হলো, এই ভেজাল মেশানো ডিজেলও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘাটের পাশেই পুলিশের একটি ফাঁড়ি থাকা সত্ত্বেও তাদের চোখের সামনেই দিনরাত চলছে এই রমরমা ভেজাল ব্যবসা। এ বিষয়ে রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জি এম সরওয়ার স্পষ্ট জানিয়েছেন, এসব কারবারিরা কেউই বৈধ তেল ব্যবসায়ী নন। তিনি বলেন, “আমাদের এলাকায় এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেখানে গ্যাস সরবরাহ লাইন আছে, সেখানে তেল বিক্রি করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কোনো ডিলার যদি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ টাকাও বেশি নেয়, তবে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এদিকে, কেরানীগঞ্জের তেলঘাটে প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তারা দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সাধারণ মানুষ ও বৈধ ব্যবসায়ীরা এখন এই ‘মিকচার জাহাঙ্গীর’ সিন্ডিকেটের হাত থেকে তেলঘাটকে মুক্ত করার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া