কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা: চালক-যাত্রীবেশে ওত পেতে থাকা সেই ভয়ংকর চক্র গ্রেপ্তার

কুমিল্লায় কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে সংঘটিত এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের পাঁচ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চালক ও যাত্রীবেশে ওত পেতে থাকা এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ওই কর্মকর্তাকে হত্যা করে সবকিছু লুটে নেয়।


আজ সোমবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-ইমরান হোসেন হৃদয় (৩৭), মোহাম্মদ সোহাগ (৩০), ইসমাইল হোসেন জনি (২৫), মোহাম্মদ সুজন (৩২) ও রাহাতুল রহমান জুয়েল (২৭)। রোববার কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে তাঁদের হেফাজত থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, চাপাতি এবং একটি ধারালো সুইচ গিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।


র‍্যাব জানায়, চক্রটি মূলত কুমিল্লার মহাসড়ক ও বিশ্বরোড এলাকায় গভীর রাতে সক্রিয় থাকে। তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে টহল দেয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা নিঃসঙ্গ যাত্রীদের ‘টার্গেট’ করে। ঘটনার রাতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রাম থেকে তাঁর ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লায় ফিরছিলেন। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে তিনি যখন জাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় পৌঁছান, তখন গ্রেপ্তার জুয়েল অত্যন্ত কৌশলে তাঁর গন্তব্য জানতে চায়। বুলেট বৈরাগী জাঙ্গালিয়া যাওয়ার কথা জানালে আগে থেকেই অটোরিকশায় যাত্রীর বেশে বসে থাকা সোহাগ ও হৃদয়ের পাশে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়।


সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, যাত্রাপথে নির্জন এলাকায় পৌঁছালে অটোরিকশার ভেতরে থাকা চক্রের সদস্যরা বুলেট বৈরাগীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কাছে থাকা স্মার্টফোন, নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় মালামালসহ ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বুলেট বৈরাগী বাধা দিলে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে তাঁর প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে চক্রের সদস্যরা চলন্ত অটোরিকশা থেকে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। এতে মাথা ও মুখে মারাত্মক আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। শনিবার সকালে কোটবাড়ী এলাকার একটি হোটেলের পাশ থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।


পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুলেট বৈরাগী ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী ও একটি ছোট সন্তান রয়েছে। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দ্রুত বাসায় পৌঁছানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যেই ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে থেমে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ।


এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাতে নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। অপরাধীদের এমন ‘ছদ্মবেশী’ অপরাধের ধরণ সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।