কানাডার ‘বেগমপাড়ায়’ ২০ কোটির আলিশান বাড়ি, নেপথ্যে কি ঢাকা ওয়াসার বর্তমান এমডি?

ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ পদে পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র একে একে সামনে আসতে শুরু করেছে। এবার খোদ সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারীর পরিবারের বিরুদ্ধে কানাডার টরন্টোতে বিলাসবহুল বাড়ি কেনার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। দেশটির ভূমি নিবন্ধন অফিস ‘সার্ভিস অন্টারিও’ থেকে সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই সম্পদের হদিস মিলেছে।


অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ কানাডার টরন্টোতে একটি বাড়ি কেনা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাড়িটির মালিকানায় আব্দুস সালাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছা-উভয়ের নাম ছিল। তবে ২০২৩ সালে এসে মালিকানার ধরনে কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়। তখন আব্দুস সালামের নাম সরিয়ে তাঁর এক ছেলেকে মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাড়িটির একক মালিকানা রয়েছে তাঁর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছার নামে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বাড়িটি কেনার সময় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল, যার বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকায়।


উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অনেকটা তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় আব্দুস সালামকে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। নিয়োগের শর্ত শিথিল ও তদ্বিরের মাধ্যমে তিনি শীর্ষ পদে আসীন হন বলে অভিযোগ রয়েছে।


কানাডায় এই বিপুল সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আব্দুস সালাম ব্যাপারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, বাড়িটি তাঁর সন্তানেরা কিনেছেন। তবে তাঁর সন্তানেরা কতদিন ধরে চাকরিতে আছেন বা তাঁদের আয়ের নির্দিষ্ট উৎস কী, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। উল্টো ‘ব্যক্তিগত’ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে মামলার হুমকি প্রদান করেন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকা ওয়াসার কার্যালয়ে সাংবাদিকরা তথ্য জানতে গেলে তিনি দীর্ঘক্ষণ ব্যক্তিগত গল্প করলেও নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান। এমনকি তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য অনৈতিক প্রস্তাবও দেন বলে জানা গেছে।


ঢাকা ওয়াসা সূত্রমতে, আব্দুস সালামের স্ত্রী মাহবুবুন্নেছা নিজেও সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। ২০০৮ সালে দুই ছেলেকে নিয়ে কানাডায় গিয়ে তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি। তাঁর দুই ছেলে যথাক্রমে ২০১৭ ও ২০২১ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে চাকরিতে প্রবেশ করেন। প্রশ্ন উঠেছে, কর্মজীবনের মাত্র কয়েক বছরে দুই ছেলের আয়ে ১২ কোটি টাকার বাড়ি কেনা কতটা বাস্তবসম্মত। সরকারি কর্মচারী আইন অনুযায়ী, পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিদেশে সম্পদ অর্জন করলে তা সরকারকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আব্দুস সালাম তা করেননি বলে জানা গেছে।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এই সম্পদের প্রকৃত মালিকানা লুকানোর উদ্দেশ্যেই বারবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁর মতে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা প্রয়োজন।


এদিকে, বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তিনি এখনো এই কর্মকর্তার বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না। মন্ত্রণালয় দায়িত্ব নেওয়ার পর সব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।