এবার বর্ষবরণের মূল সুর ‘গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তুতির মহোৎসব

দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। বর্ণিল রং, তুলির আঁচড় আর সৃজনশীলতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে সেখানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে এবারের বর্ষবরণে যুক্ত হয়েছে এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল। দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শিরোনামে নতুন এক যাত্রার সূচনা হতে যাচ্ছে।

চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ এ বিষয়ে জানান, এটি একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। তিনি বলেন, “আনন্দ ও মঙ্গলের শাশ্বত ধারণাটিকে সামনে রেখেই বিভিন্ন মতের সমন্বয়ে আমরা এই বৃহত্তর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এই উৎসবের মাধ্যমে গোটা জাতিকে একটি অভিন্ন ঐক্যের সুতোয় বেঁধে ফেলা।”

বর্তমানে চারুকলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক মহাব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে লোকজ ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। কেউ তৈরি করছেন বিশাল সব মুখোশ, কেউ মাটির অবয়বে দিচ্ছেন রঙের প্রলেপ, আবার কেউ ব্যস্ত চাটাই বোনা বা বিশাল কাঠামো নির্মাণে। এবারের আয়োজনের বিশেষ দিক হলো এর প্রতিপাদ্য—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে তৈরি হচ্ছে পাঁচটি বিশালাকার ‘মোটিফ’।

ভাস্কর্য বিভাগের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী দীপক রঞ্জন সরকার জানান, এবারের শোভাযাত্রায় বাউল সংস্কৃতির ওপর চলমান আঘাতের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ‘দোতারা’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকবে নতুন দিনের সূচনার প্রতীক ‘মোরগ’। এরপর পর্যায়ক্রমে থাকবে শান্তির বার্তাবাহী ‘পায়রা’, লোকজ ঐতিহ্যের হাতি ও ঘোড়া। এছাড়া বাঘ ও পেঁচার প্রায় চার শতাধিক মাস্ক বা মুখোশ হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা এই বর্ণিল মিছিলে অংশ নেবেন। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণকারীদের মুখে কোনো মুখোশ পরার অনুমতি দেওয়া হবে না।

এবারের বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের সার্বিক দায়িত্ব পালন করছে চারুকলার ৭১তম ব্যাচ। ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী সুপ্রিয় জানান, কোনো বিশেষ স্পন্সর বা বাণিজ্যিক সহযোগিতা নয়, বরং নিজেদের তৈরি শিল্পকর্ম বিক্রি এবং ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমেই পুরো উৎসবের বাজেট সংস্থান করা হচ্ছে। মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী মাধুর্য বিশ্বাস মনে করেন, নাম যেটাই হোক না কেন, উৎসবের মূল চেতনা ও সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় বিষয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইউনেস্কো কর্তৃক ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’র মর্যাদা পাওয়া এই উৎসবের বীজ বপন হয়েছিল আজ থেকে ৪১ বছর আগে। ১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল যশোরের ‘চারুপীঠ’ চত্বর থেকে শিল্পী মাহবুব Jamal শামীমের নেতৃত্বে প্রথমবার এই শোভাযাত্রা বের হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ঢাকার চারুকলায় এটি শুরু হয়। শুরুতে এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত থাকলেও পরে ওয়াহিদুল হক ও শিল্পী এমদাদ হোসেনের প্রস্তাবে এর নাম হয়েছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

আগামী ১লা বৈশাখ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে এই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শুরু হবে। এটি রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হবে। দেশজুড়ে এখন এই নতুন নামে নতুন সূচনার অপেক্ষা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া