আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দান এখন আর কেবল চার-ছক্কার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনা ‘উইজডেন’-এর সম্পাদক লরেন্স বুথ তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, ক্রিকেট বিশ্ব এখন এক ‘অরওয়েলিয়ান’ (Orwellian) বা স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (IPL) বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এই দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় আইপিএলের নিলামে, যেখানে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) ৯.২ কোটি রুপির বিশাল অংকে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভিড়িয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ভারতের কট্টর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর তীব্র চাপের মুখে এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) সরাসরি হস্তক্ষেপে মোস্তাফিজকে শেষ পর্যন্ত স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয় কেকেআর কর্তৃপক্ষ। লরেন্স বুথ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ক্রীড়াভিত্তিক ছিল না; বরং এটি ছিল নিখাদ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ।
এই ঘটনার রেশ পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। নিরাপত্তার চরম উদ্বেগ দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলতে চাইলেও আইসিসি সেই অনুরোধ সরাসরি নাকচ করে দেয়। আইসিসির এমন অনমনীয় ও বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতিবাদে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেই নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
লরেন্স বুথ আইসিসির এই ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে একে ‘দ্বৈত নীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির উদাহরণ টেনে বলেন, যেখানে ভারতের একক অনুরোধে ভেন্যু পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবি কেন মানা হলো না? পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কটের হুমকি এসেছে, যা ক্রিকেট অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর দশাকেই বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
উইজডেনের প্রতিবেদনে বিসিসিআই-এর সাথে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের গভীর যোগসূত্রের বিষয়টিও উঠে এসেছে। বুথ উল্লেখ করেন, এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের পর ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সেই জয়কে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি উৎসর্গ করেন। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়কে ‘অপারেশন সিঁদুর’ হিসেবে অভিহিত করে খেলার মাঠে রাজনীতির রঙকে আরও গাঢ় করেছেন।
সবশেষে বুথ পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (PCB) চেয়ারম্যান মহসিন নকভিরও সমালোচনা করেন। নকভি যখন দাবি করেন যে ‘রাজনীতি ও খেলাধুলা একসঙ্গে চলতে পারে না’, তখন বুথ মনে করিয়ে দেন যে নকভি নিজেই একই সাথে তাঁর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। লরেন্স বুথের মতে, ক্রিকেট এখন এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে যেখানে খেলার স্পিরিট বা আত্মাকে রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বলি দেওয়া হচ্ছে। মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনাটি কেবল একজন ক্রিকেটারের বঞ্চনা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচালন ব্যবস্থায় ঘুণে ধরা বৈষম্য ও প্রভাবশালীদের আধিপত্যেরই এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।