মরক্কোর গোলকধাঁধায় আটকে গেল হেক্সা মিশন? ব্রাজিলের ড্রয়ের নেপথ্যে ৬টি বড় ক্ষত

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ 'সি'-র হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হয়ে হোঁচট খেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। মাঠের লড়াই ১-১ ড্রয়ে শেষ হলেও, স্কোরলাইন দিয়ে সেলেসাওদের পারফরম্যান্সের প্রকৃত করুণ দশা ফুটে উঠছে না। পুরো ৯০ মিনিট জুড়েই মরক্কোর গতির কাছে কার্যত দিশেহারা মনে হয়েছে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তিকে। মাঠের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ—সবখানেই ছিল ঘাটতির ছাপ। ফুটবল বিশ্লেষক ও ‘দেশ মিডিয়া’র বিশেষ অনুসন্ধানে ব্রাজিলের এই বিপর্যয়ের পেছনে ৬টি সুনির্দিষ্ট কারণ উঠে এসেছে।

১. মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণহীনতা:
ম্যাচের সবচেয়ে দুর্বল দিক ছিল ব্রাজিলের মিডফিল্ড। মরক্কোর তরুণ তুর্কি আইয়ুব বুয়াদি এবং বিলাল এল-খান্নৌসের ছন্দময় ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি অভিজ্ঞ ব্রাজিলিয়ান মাঝমাঠ। বিশেষ করে কাসেমিরোর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এই ম্যাচে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। বল পুনরুদ্ধার করা বা আক্রমণ রোখা—কোনো বিভাগেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, কোচ কার্লো আনচেলত্তি হাফটাইমেই তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হন।

২. রক্ষণভাগের পজিশনাল ভুল:
লুকাস পাকেতা মাঝমাঠে বল হারানোর পর থেকেই রক্ষণে ফাটল ধরে। মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ যখন ইসমাইল সাইবারিকে থ্রু-বল দেন, তখন সেন্টার-ব্যাক মারকিনিয়োস ও গাব্রিয়েল ছিলেন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। তাঁদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং গতির অভাব সাইবারির কাজকে সহজ করে দিয়েছিল। একটি পেশাদার দলের কাছে এমন মৌলিক ডিফেন্সিভ ভুল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।

৩. গোলরক্ষক আলিসনের ভুল সিদ্ধান্ত:
লিভারপুল তারকা আলিসন বেকারের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের বিপদ বাড়িয়ে দেয়। সাইবারির পায়ে যখন বল, তখন অহেতুক পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন আলিসন। অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষকের টাইমিং ছিল ভুল, যা প্রতিপক্ষকে শান্তভাবে বলটি লব করার সুযোগ করে দেয়। আলিসন গোললাইন ধরে রাখলে ডিফেন্ডারদের জন্য ট্যাকল করার বাড়তি সুযোগ তৈরি হতো।

৪. প্রেসিং কৌশলের চরম ব্যর্থতা:
কোচ আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ব্রাজিলের ‘হাই প্রেস’ দেওয়ার কৌশল বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিল যখন ওপরে উঠে খেলার চেষ্টা করেছে, মরক্কো অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে উইং ব্যবহার করে দ্রুতগতির কাউন্টার-অ্যাটাকে গেছে। আশরাফ হাকিমিদের ডান প্রান্তের দৌড় থামাতে ব্যর্থ হয়েছে ব্রাজিলের উইং-ব্যাকরা।

৫. সৃজনশীলতার অভাব ও ভিনি-নির্ভরতা:
ব্রাজিলের আক্রমণভাগে দলীয় কোনো পরিকল্পনার ছাপ ছিল না। সমতাসূচক গোলটি এসেছে সম্পূর্ণ ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত জাদুতে। ভিনির সেই মুহূর্তটি না থাকলে ব্রাজিলের কপালে হার নিশ্চিত ছিল। ম্যাচের ১৪ মিনিটে ইগোর থিয়াগোর সহজ গোল মিস করা এবং ৭৮ মিনিট পর্যন্ত কোনো সুসংগঠিত সুযোগ তৈরি করতে না পারা ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড লাইনের দৈন্যদশাই ফুটিয়ে তুলেছে।

৬. মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও অস্থিরতা:
সবশেষে উঠে এসেছে দলের মানসিক প্রস্তুতির অভাব। আনচেলত্তির মতে, শুরু থেকেই দল ‘নার্ভাস’ বা স্নায়ুচাপে ভুগছিল। হেক্সা মিশনের বাড়তি চাপ আর মাঠে মরক্কোর আক্রমণাত্মক ফুটবলের মুখে বারবার বলের দখল হারানো এবং অপ্রয়োজনীয় ফাউল করা ছিল সেই অস্থিরতারই লক্ষণ।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে টিকে থাকতে হলে এবং শিরোপা ঘরে তুলতে হলে ব্রাজিলকে অচিরেই এই ট্যাকটিক্যাল ও মেন্টাল জট খুলতে হবে। অন্যথায়, ‘হেক্সা’র স্বপ্ন আরও একবার অঙ্কুরেই ঝরে যাওয়ার শঙ্কা দেখছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।