সান ফ্রান্সিসকোর মাঠে আজ ভোরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ গোলের দাপুটে জয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই জয় ছাপিয়ে এখন বিশ্ব ফুটবলে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন ফরোয়ার্ড ফ্লোরিয়ান বালোগানের পাওয়া একটি বিতর্কিত লাল কার্ড। রেফারির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা, যেখানে ঘুরেফিরে আসছে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির প্রায় একই ধরনের একটি ফাউলের ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে—একই অপরাধে মেসি পার পেলেও কেন বালোগানকে মাঠ ছাড়তে হলো?
ম্যাচের প্রথমার্ধে ৪৫ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেওয়া বালোগান ৬৪ মিনিটে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হন। বসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। মুহারেমোভিচ বল ক্লিয়ার করার সময় বালোগানের ডান পা তাঁর গোড়ালির ঠিক ওপরের অংশে পড়ে যায়। শুরুতে ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস বিষয়টিকে সাধারণ ফাউল হিসেবেও গণ্য করেননি, এমনকি ফ্রি-কিকের নির্দেশও দেননি। কিন্তু বল মাঠের বাইরে যাওয়ার পর ভিএআর (VAR) কক্ষ থেকে সংকেত পাওয়ায় তিনি মাঠের ধারের মনিটরটি দেখতে যান। দীর্ঘক্ষণ রিপ্লে পর্যবেক্ষণের পর আচমকাই বালোগানকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান ক্লাউস, যা মাঠের খেলোয়াড় ও গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের স্তম্ভিত করে দেয়।
বিতর্কের মূল কারণ মূলত আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে লিওনেল মেসির করা একটি ট্যাকল। সেই ম্যাচে আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার মান্দিকে প্রায় একইভাবে বুটের তলা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছিলেন মেসি। পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়াক ফাউলের বাঁশি বাজালেও মেসিকে কোনো কার্ড দেখাননি, এমনকি বিষয়টি ভিএআর-এ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করেননি কেউ।
এই বৈষম্য নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে সরব হয়েছেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড। তিনি বলেন, “ঠিক এই জায়গাতেই মানুষ ভিএআর নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমরা সবাই নিয়মের অভিন্ন প্রয়োগ দেখতে চাই। মেসির সেই ট্যাকলটি আমাদের সবার মনে আছে, যা পরিষ্কার লাল কার্ড পাওয়ার মতো ছিল। অথচ বালোগানের ক্ষেত্রে ভিএআর নাক গলাল এবং সরাসরি লাল কার্ড দিয়ে দেওয়া হলো। এই আলাদা নিয়মই খেলোয়াড় ও কোচদের হতাশ করে।”
একই সুরে কথা বলেছেন ইংল্যান্ড নারী দলের সাবেক স্ট্রাইকার সু স্মিথও। তাঁর মতে, ভিডিও রিপ্লেতে ফ্রেম যখন স্থির করে রাখা হয়, তখন এটি অনেক বেশি ভয়ংকর মনে হতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক গতিতে দেখলে বোঝা যায়, এটি ছিল কেবলই একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফরোয়ার্ড ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার ক্লিন্ট ডেম্পসিও কড়া সমালোচনা করে বলেন, রেফারির এমন সিদ্ধান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়া মোটেও কাম্য নয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে বড্ড বেশি কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো ম্যাচ শেষে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বেশ ক্ষোভ ঝাড়েন। তিনি সরাসরি দাবি করেন, বালোগান বা মেসি—কারোর ফাউলই লাল কার্ড পাওয়ার মতো ছিল না। তিনি বলেন, “বালোগানের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। এটি কখনোই সরাসরি লাল কার্ড হতে পারে না।”
এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন না যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার। নকআউট পর্বের আগে দলের মূল আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় ধরনের ‘ডেডলাইন’ বা চ্যালেঞ্জের মুখে। ফুটবলের এই আধুনিক যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে স্বচ্ছতা আনার কথা, সেখানে তারকাভেদে এমন ‘দ্বিমুখী’ প্রয়োগ নিয়ে ফুটবল বিশ্বের বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।