বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের লড়াইয়ে বেলজিয়াম ও সেনেগালের মধ্যকার ম্যাচের ফলাফল ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি ‘বিতর্কিত’ পেনাল্টি। ম্যাচ শেষে ফুটবল বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—সবার মনেই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, ১২০ মিনিটের মাথায় দেওয়া সেই সিদ্ধান্তটি কি আসলেই সঠিক ছিল?
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের একেবারে অন্তিম লগ্নে ঘটে সেই আলোচিত ঘটনা। বেলজিয়ামের আক্রমণ রুখতে সেনেগালের বক্সে বাড়ানো একটি নিচু ক্রস ক্লিয়ার করতে স্লাইড করেছিলেন মিডফিল্ডার লামিন কামারা। তাঁর সেই ডান পায়ের স্লাইডিং ট্যাকলটি ঘিরেই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত। বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার ইউরি টিলেমান্স সেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেলে পেনাল্টির জোরালো দাবি ওঠে। শুরুতে মাঠের রেফারি সাইদ মার্তিনেজ খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও বল মাঠের বাইরে যাওয়ার সাথে সাথে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংকেত দেয়।
রেফারি যখন মাঠের পাশের মনিটরে রিপ্লে দেখতে যাচ্ছিলেন, তখনই বেলজিয়ামের টিলেমান্স এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি পেনাল্টি স্পটের পাশে গিয়ে পজিশন নেন। দীর্ঘক্ষণ রিপ্লে পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত পেনাল্টির বাঁশি বাজান হন্ডুরাসের রেফারি মার্তিনেজ। এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেনেগালের ফুটবলাররা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পেনাল্টি শট নেওয়া পর্যন্ত মাঝখানের সময়টুকুতেই নষ্ট হয় প্রায় সাত মিনিটের বেশি। সেনেগালের পাথে সিস তো প্রতিবাদ হিসেবে পেনাল্টি স্পটের ওপরই শুয়ে পড়েন, যা গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মাঝে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
এই ঘটনাটি অনেককেই মনে করিয়ে দিচ্ছিল গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) ফাইনালের কথা। সেবারও ঠিক একইভাবে শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি নিয়ে বিতর্কের জেরে সেনেগালের শিরোপা কেড়ে নিয়ে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। সিয়াটলের এই ম্যাচেও সেই একই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি দেখল ফুটবল বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত টিলেমান্সের নিখুঁত স্পট কিক থেকে গোল পেয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বেলজিয়াম, যা তাদের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বোদ্ধাদের মাঝে চলছে কড়া সমালোচনা। ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছেন, ওটা কোনোভাবেই পেনাল্টি ছিল না। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি রয় কিন রেফারির দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি বড্ড কঠোর হয়ে গেছে। রেফারি মনিটর দেখতে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন, যা তাঁর নিজের সিদ্ধান্তহীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে।’
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও নিজের হতাশা লুকাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি আমাদের টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে দিল। তবে এটাও সত্যি যে ফুটবল ম্যাচ ৮৫ মিনিটের হয় না। ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও আমরা শেষ মুহূর্তের চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়েছি।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্পোর্টিং নিউজ’ অবশ্য রেফারির পক্ষেই যুক্তি দিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওভারহেড ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা গেছে কামারার স্লাইডিং চ্যালেঞ্জটি সরাসরি টিলেমান্সের পায়ে আঘাত করেছিল। যদিও শুরুতে সেটি মৃদু মনে হয়েছিল, কিন্তু উচ্চগতির ক্যামেরায় ফাউল হওয়ার মতো পর্যাপ্ত উপাদান পাওয়া গেছে বলেই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। বিতর্ক যাই হোক, মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হাসি ফুটেছে বেলজিয়ামের মুখেই, আর বুকভরা বিষাদ নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে সেনেগালকে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।