অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সেই বিখ্যাত তত্ত্ব ও ২০২৬ বিশ্বকাপের বর্ণিল রন্ধনশৈলী

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। উত্তর আমেরিকার তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এই মেগা আসরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। তবে এই বিশ্বকাপ কেবল সবুজ গালিচার ড্রিবলিং বা চোখধাঁধানো গোলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে এক মহাদেশীয় সাংস্কৃতিক ও রন্ধনশৈলীর রোমাঞ্চকর সফর। প্রখ্যাত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লেখক আহমদ ছফাকে একবার বলেছিলেন, কোনো নতুন জনপদকে চিনতে হলে সেখানকার মানুষের খাদ্যাভ্যাস আর পড়াশোনা সম্পর্কে জানা জরুরি। সেই দর্শনকে পাথেয় করে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর স্বাদের মানচিত্র বিশ্লেষণ করেছে দেশ মিডিয়া।

মেক্সিকোর কথা বললেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বখ্যাত ‘টাকোস’। সাধারণ টর্টিলা রুটির ভাঁজে রসালো মাংস, তাজা সবজি আর জিভে জল আনা সসের মেলবন্ধন—টাকোস কেবল একটি খাবার নয়, মেক্সিকোর ঐতিহ্যের প্রতীক। এর বাইরেও এনচিলাডা, কেসাডিলা কিংবা পোজোলের মতো ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবারের এক অনন্য ভাণ্ডার রয়েছে সেখানে। মেক্সিকান খাবারে আদিবাসী এবং স্প্যানিশ প্রভাবের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়, যা প্রতিটি গ্রাসকে করে তোলে ঐতিহাসিক। মেক্সিকোর রাস্তায় দাঁড়িয়ে টাকোস হাতে লাতিন সুরের মূর্ছনা উপভোগ করা ফুটবল ভক্তদের জন্য হবে এক অনন্য সামাজিক অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র হলো বহু জাতির এক মিলনমেলা, যার প্রতিফলন ঘটেছে তাদের খাদ্যাভ্যাসেও। বিশ্বজুড়ে ফাস্ট ফুড সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘আমেরিকান বার্গার’ এই বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে যাচ্ছে। নরম বানের ভেতরে রসালো প্যাটি আর চিজের সেই ধ্রুপদী স্বাদ ছাড়াও হট ডগ, ফ্রায়েড চিকেন কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার ফিউশন কুইজিন ভোজনরসিকদের সামনে হাজির করবে উদ্ভাবনী স্বাদের নতুন এক জগত। যুক্তরাষ্ট্রের রন্ধনশালা মূলত একটি ‘মেল্টিং পট’, যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উপকরণের নিরীক্ষা চলে। নিউ ইয়র্কের পিৎজা থেকে শুরু করে টেক্সাসের বারবিকিউ—প্রতিটি প্রদেশেই রয়েছে আলাদা স্বাদের গল্প।

কানাডার প্রেক্ষাপট আবার কিছুটা ভিন্ন এবং অনন্য। সেখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ‘পুটিন’, যা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ওপর চিজ কার্ড আর গ্রেভি সসের এক জাদুকরী মিশেল। এ ছাড়া কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদের অনন্য দান ‘ম্যাপল সিরাপ’ প্যানকেক থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবারে এক অন্যরকম আভিজাত্য যোগ করে। ব্রিটিশ ও ফরাসি ঐতিহ্যের প্রভাব কানাডার খাবারকে করেছে সরল অথচ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। কুইবেক অঞ্চলের ফরাসি ধাঁচের রান্না যেমন ঐতিহ্যের ধারক, তেমনি আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়াও সেখানে স্পষ্ট।

তিনটি দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব আর সাংস্কৃতিক ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় তারা অভিন্ন—আর তা হলো ‘স্ট্রিট ফুড’ বা রাস্তার ধারের খাবারের জনপ্রিয়তা। ফুটবলের জাদুকরী মুহূর্তগুলো উপভোগ করার ফাঁকে ভক্তরা যখন মেক্সিকোর টাকোস, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড ট্রাকের বার্গার কিংবা কানাডার ফাস্ট ফুড স্টলগুলোতে ভিড় করবেন, তখনই মূলত বিশ্বায়নের এই যুগে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটবে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, এই রন্ধনযাত্রার মাধ্যমেই দর্শক ও পর্যটকরা উত্তর আমেরিকার মানুষের জীবনবোধ আর ইতিহাসকে আরও নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ পাবেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে স্বাদের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।